বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
পঞ্চগড়ের নৌকাডুবিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৫, নিখোঁজ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রফি ভাঙা সেই ইউএনওকে ঢাকায় বদলি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তিন ফসলি কৃষিজমি ধ্বংস করে কোন কিছু করা যাবে না বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাদৃশ্যে নানা উৎসবে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ : ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে : উপাচার্য শ্যামনগরের কাঁশিমাড়িতে বজ্রপাত প্রতিরোধে তিন কিলোমিটার রাস্তায় তালবীজ বপন রামপালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেলেন ৩ সহস্রাধিক রোগী  খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ সোসাইটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের সকলের দায়িত্ব : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী রামপাল তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রের মালামালসহ ০৬ ডাকাত গ্রেফতার

সংস্কারের অভাবে বিধ্বস্ত বিজ্ঞানী পিসি রায়ের জন্মভিটা, পর্যটন কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী

সংবাদদাতার নাম :
  • প্রকাশিত সময় মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২
  • ৪৩ পড়েছেন

বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী পিসি রায়ের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী আজ :

 

বিশেষ প্রতিনিধি।।

                            বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী রসায়নবিদ শিল্পী ও কবি স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬১তম জন্ম দিন আজ। পি. সি. রায় নামেও পরিচিত বিজ্ঞানী স্যার আর্চায্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ১৮৬১সালের ২আগস্ট খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী রাড়ুলী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আরবী, ফার্সী ও ইংরেজী ভাষায় দক্ষ জমিদার হরিশ্চন্দ্র রায় ও মাতা ভূমন মোহিনী দেবী। পিতা-মাতার আদরে সন্তান প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে পিতা ডাকতেন ফুলু বলে। ফুলুর শিক্ষা জীবন শুরু হয় পাঁচ বছর বয়স থেকে। ১৮৬৬থেকে ১৮৭০সাল এ চার বছর কাটে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ১৮৭১সালে তিনি ভর্তি হন কলিকাতার হেয়ার স্কুলে। তারপর ১৮৭৪ অ্যালবার্ট স্কুলে। এখান থেকেই ১৮৭৮সালে এন্টান্স, ১৮৮১ সালে এফ,এ পাশ করেন তিনি। ১৮৮২সালে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি এবং অনার্সসহ স্নাতক পাশ করেন। তার অসাধারন মেধার বলে তিনি গিলক্রিইষ্ট বৃত্তি নিয়ে চলে যান এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই বিএসসি ডিগ্রি নেন। বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণায় তিনি আত্ননিয়োগ করে মাত্র ৩৪বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে রসায়নের জটিল মারকিউরাস নাইট্রাইট নামক এসিড আবিস্কার করে বিশ্বে আড়োলন সৃষ্টি করেন। এরপর সম্মান সূচক ডিগ্রী ১৮৮৬সালে পি,এইচ,ডি, ১৮৮৭ সালে ডি,এস,সি, ১৯১১সালে সি,আই,ই, ১৯১২ সালে আবার ডি,এস,সি ডিগ্রি পান। আধুনিক বিজ্ঞানে তার কৃতিত্বের জন্য লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বেনারশ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় তাকে সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। পরে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালে তাকে নাইট উপাধি দেয়। পিসি রায় বিজ্ঞান সাধনার ফলাফলের সফল প্রয়োগ ঘটান ভারতবর্ষে প্রথম বেঙ্গল কেমিকালের মত শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। দেশ-বিদেশে তার প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আজও মানব সেবায় অবদান রাখছে।

দেশ-বিদেশে বিরল সাধনার ক্ষেত্রে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ছাড়া এমনভাবে বাঙালী মানুষকে অন্য কেউ মহিমান্বিত করতে পারেনি। পি.সি রায় ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী, দার্শনীক ও শিল্পী। সমাজ সংস্কারে মানবতাবোধে উজ্জীবিত ছিলেন তিনি। বিজ্ঞানী হলেও তিনি উপমহাদেশের প্রথম সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে সমবায় আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ হিসেবে শুধু  দেশেই নয়-সারা পৃথিবীতে খ্যাতি অর্জন করেন। তদানিন্তন সময়ে পল্লীর মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১৯০৯সালে পিসি রায় নিজ জন্মভূমিতে রাড়ুলী সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক নামে সরমায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। যে ব্যাংকের কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। ১৯০৩ সালে বিজ্ঞানী স্যার পিসি রায় তার পিতার নামে এলাকার চারটি গ্রামের নাম মিলে দক্ষিণ বাংলায় প্রথম আর,কে,বি,কে হরিশচন্দ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেন। স্কুলটিকে সম্প্রসারন করে বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল হিসেবে কার্যক্রম চলছে। তবে পিসি রায় প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির তেমন কোন উন্নয়ণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকার মানুষ। এছাড়া বসত বাড়ীর পাশেই স্যার পিসি রায়ের পিতা উপমহাদেশে নারী শিক্ষা উন্নয়নকল্পে পিসি রায়ের মায়ের নামে ১৮৫০সালে রাড়ুলী গ্রামে ভূবনমোহিনী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তবে নারী শিক্ষার অন্যতম এই বালিকা বিদ্যালয়টি এখন খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। স্থানীয় রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও সরকারের প্রশাসনের কর্মকর্তারা পিসি রায় প্রতিষ্ঠিত স্কুল, ব্যাংকসহ প্রতিষ্টানগুলির উন্নয়নে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি। যদিও প্রতি বছর এই বিজ্ঞানীয় জন্মদিনের অনুষ্টানে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। তারপরেও প্রতিষ্ঠানগুলো স্বমহিমায় মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে। দেশ-বিদেশে তার স্থাপিত প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞান সাধনায় ফলক স্মরণ করে সর্বস্তরের মানুষ।

পিসি রায় ব্যক্তি জীবনে অবিবাহিত ছিলেন। ১৯৪৪ সালে ১৬জুন কোন উত্তরসূরী না রেখে জীবনাবসান ঘটে বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একটি ভূমিদস্য ও দখলদার চক্র জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পি,সি রায়ের জন্মভূমি স্মৃতি চিহ্ন বসতভিটাসহ বিপুল পরিমান জমি দখল করে নেয়।সর্বশেষ ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে পিসি. রায়ের জন্ম স্থান অন্দর মহলের স্মৃতিচিহ্ন বসতভিটা দখল নেয় স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তার আকামত আলীসহ একটি প্রভাবশালী মহল। এতে ফুসে উঠে পি,সি,রায় প্রেমী এলাকার সচেতন মানুষ। কঠোর আন্দোলনের মুখে নড়েচড়ে বসে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। এলাকবাসীর কঠোর প্রতিরোধের ফলে সে সময় রাতের অন্ধকারে বাড়ীর অনেক মূল্যবান সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যায় কথিত দখলদাররা। ১৯৯৬ সালের ৯নভেম্বর পিসি রায়ের বাড়িটি পুরাকৃর্তি হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। বাড়ির ৫একর ১৪ শতক জমির মধ্যে ৪ একর জমি অবৈধ দখলে চলে যায়। ২০১৪সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মাত্র ১দশমিক ১৪শতক জমির অধিগ্রহণ করে রক্ষনা-বেক্ষণ শুরু করে।  পরে প্রশাসনের প্রচেষ্টায় দখলকৃত জমি উদ্ধার হলেও সংস্কার ও মেরামত না করায় মুছে যাচ্ছে বাঙালী এ বিজ্ঞানীর স্মৃতিচিহ্ন। তারপর থেকে স্থানীয়দের উদ্যোগে পিসি রায় স্মৃতি সংসদ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে প্রখ্যাত এই বিজ্ঞানীর জন্মভিটাসহ পৈত্রিক বাড়ী দখলমুক্ত করা এবং সরকারী উদ্যোগে তার জন্মদিন পালনের দাবী জানায়। পরে ২০১৪ সাল থেকে পিসি রায়ের জন্মভিটা ও বাড়ি সরকারের প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ সংরক্ষণ করে এবং সরকারী উদ্যোগে পালিত হয়ে আসছে তার জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী।

এলাকাবাসীর মতে, বিশ্ব বরেণ্য এ বিজ্ঞানীর বসত বাড়িকে কেন্দ্র করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পি.সি রায় প্রেমী বিজ্ঞানীর জীবনী সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবে। স্যার পি সি রায় স্মৃতি সংসদের সভাপতি ডা: মুহাম্মদ কওসার আলী গাজী’, সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী রফিকুল আলম সরদার ও অন্যতম সদস্য শিক্ষক হরেকৃষ্ণ দাশ জানান, দ্রুত সরকারীভাবে স্যার পিসি রায়ের পৈত্রিক বাড়ীর সব জমি দখলমুক্ত করে এবং জন্মভিটাসহ বাড়ী সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন করা হোক। একই সাথে পিসি রায়েল স্মৃতিকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে জাতীয় পর্যায়ে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনেরও দাবী জানান। তাহলে অবহেলিত এ অঞ্চলের দেশে-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি ঘটবে বলে তারা মনে করেন।

রাড়ুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, আবুল কালাম আজাদ ও পাইকগাছা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইকবাল মন্টু বিশ্ববরেন্য এ বিজ্ঞানীর অনবদ্য সৃষ্টি নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং বিজ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য পাঠ্য বইয়ে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জীবনী এবং অবৈধ দখলমুক্ত করে বসতভিটা মেরামত ও পযর্টন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবী জানান। একই সাথে জগৎ বিখ্যাত এই বিজ্ঞানীর স্মৃতিকে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পিসি রায়ের নামে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেরও দাবী জানান এই জনপ্রতিনিধিরা।

ক্ষণজন্মা এই শিক্ষানুরাগী, সমবায়ের জনক, সমাজ সেবক ও বিজ্ঞানীর অমর কৃর্তিকে ধরে রাখা এবং তার কর্মময় জীবন ও গবেষণা বিষয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান খুলনার জেলা প্রশাসক মো: মনিরুজ্জামান তালুকদার।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মোঃ আকতারুজ্জামান বাবু জানান, তিনি গত কয়েক বছর ধরে এলাকাবাসীর সাথে থেকে পিসি রায়ের পৈত্রিক বাড়ী ও জমি দখলমুক্ত করার উদ্যোগে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার পর তার জন্মভিটায় লাইব্রেরী, যাদুঘর ও একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার  উদ্যোগ নিয়েছেন।এটি বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ঠ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়েল মন্ত্রী ও সচিবের সাথেও তিনি কথা বলেছেন। ২০২৩ সাল থেকে পিসি রায়ের জন্মভিটায় মাসব্যাপী পিসি রায় মেলার আয়োজন করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। যার প্রেক্ষিতে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম কালিদ হোসেন ০২আগষ্ট মঙ্গলবার স্যার পিসি রায়ের ১৬১তম জন্মর্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বেলও জানান সংসদ সদস্য আকতারুজ্জামান বাবু।

জগত বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার পি.সি রায়ের বসত ভিটার দ্রুত সংস্কার ও জমি অবৈধ দখলমুক্ত করে একটি বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালা ও দৃষ্টি নন্দন পযর্টন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে যথাযথ উদ্যোগ নেবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।##

সংবাদটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করা হলো

এ ধরনের আরো সংবাদ

© All rights reserved by www.banglardinkal.com (Established in 2017)

Hwowlljksf788wf-Iu