বিশেষ প্রতিবেদন : অনবদ্য কোয়ান্টাম-মানবিক সেবায় সেঞ্চুরিয়ান

56

কানাই মন্ডল ।।

খুলনার ২৫০শয্যা জেনারেল হাসপাতলের তৃতীয় তলায় করোনা ইউনিটের ২৬নম্বর বেডে গত ৯দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মৃত. তারাপদ দাসের স্ত্রী পদ্মরানী দাস।এক সপ্তাহ ধরে জ্বর, গায়ে ব্যাথা ও তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হন এ হাসপাতালে।পরে হাসপাতালে পরীক্ষায় তার করোনা পজিটিভ সনাক্ত হয়। ডাক্তারদের চিকিৎসায় ৪/৫দিন পরে একটু ভালো হয়েছিলেন। তাতেই আশার আলো দেখছিলেন তার সাথে থাকা মেয়ে রমা রানী এবং কলেজ পড়ুয়া নাতনী বৃষ্টি ও মুক্তা। কিন্তু বুধবার থেকেই পদ্মরানীর অবস্থা আবারও খারাপ হতে থাকে। বৃহষ্পতিবার দুপুরে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে ভর্তির জন্য ছাড়পত্র দেন।বৃহষ্পতিবার আইসিইউতে নেয়ার আগেই তিনি মারা যান।পদ্মরানীর কোন ছেলে সন্তান নেই।নিজের দুই মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছেন।একাই থাকতেন বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের বাড়ীতে। মারা যাওয়ার পর তাকে সৎকার করা নিয়েই বাঁধে চরম অনিশ্চয়তা ও জটিলতা।গ্রাম থেকে একাধিক মানুষ, আত্নীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা বার বার ফোন দিতে থাকেন পদ্মরানী করোনায় মৃত্যুর কারনে তার মৃতদেহ সৎকারের জন্য গ্রামে নেয়া যাবে না। যারা এতদিন তার কাছের মানুষ ও আত্নীয় ছিলেন মানবিকতাহীন সেই মানুষগুলো হিংস্র বাঘের মত হামলে পড়লো পদ্মরানীর মৃতদেহের উপর। অসহায় হয়ে পড়লো মায়ের মৃত্যুতে দু:খ ভরাক্রান্ত ব্যাথাতুর মেয়ে ও নাতনী। তিনজন নারী কি করবেন পদ্মরানীর মৃতদেহ নিয়ে। কোথায় কিভাবে সৎকার করবেন তাকে।অপরিচিত খুলনা শহরের কোথায় নিয়ে যাবেন এ মৃতদেহ। তিনজনই হাসপাতালের বারান্দায় মৃতদেহকে ঘিরে শুধুই কাঁদছেন।যাদের সাথে ও পাশে থেকে সারাটা জীবন কাটিয়েছেন অতিপরিচিত, আত্নীয় ও প্রতিবেশী সেইসব মানুষগুলো একটি মুতদেহের প্রতি এত নির্দয় ও অমানবিক হতে পারে সেটাও তারা ভাবতে পারছেন না।পদ্মরানীর এক মেয়ের জামাইয়ের মাধ্যমে খবর পেয়ে তাদের প্রতিবেশী খুলনায় অবস্থানকারী সংবাদিক সুনীল দাস এগিয়ে আসেন।তিনি সৎকারের ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দেন।পরে সংবাদিক সুনীল দাস খুলনায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতদের দাফন ও সৎকারের মানবিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংগঠন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেন।পরে  পদ্মরানীর অন্তেষ্টিক্রিয়ার মানবিক কাজে এগিয়ে আসে কোয়ান্টাম ফাউন্টেশন। বৃহষ্পতিবার রাতে অসহায় পরিবারটির পাশে থেকে কোয়ান্টামের একটি পুরুষ টিম ও একটি নারী টিম খুলনা জেনারেল হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ নিয়ে রূপসা মহাশ্মশানে পদ্মরানীর অন্তেষ্টীক্রিয়া সম্পন্ন করেন।এ সময় সনাতন ধর্মীয় সকল বিধিবিধান ও নিয়মকানুন অনুসরণ করেই সৎকার সম্পন্ন করা হয়।শুধুই একজন পদ্মরানী দাসই নয়-কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের দাফন ও সৎকার টিম ১৫জুলাই নগরীর সোনাডাঙ্গা ক্রস রোডের বাসিন্দা সাবেক জাতীয় দলের ক্রিকেটার খুলনা শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের সাবেক ভেন্যু ম্যানেজার কাজী আব্দুস সাত্তার কচি করোনায় বেসরকারী গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয়, একই দিন বটিয়াঘাটার জলমা এলাকার আশিশ গোলদার করোনায় আক্রান্ত হয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান এবং গত ১৩জুলাই খুলনার রূপসার আইচগাতির মাহবুবার রসুল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনায় মারা গেলে তাদেরসহ ১২২জনের দাফন ও সৎকার করেছেন। করোনা মহামারীর থাবায় থমকে যাওয়া পরিস্থিতিতে অসহায় ও দিশেহারা মানুষের জন্য কোয়ান্টামের এই মানব হিতৈষী ও মানবিক সেবা কার্যক্রমকে অনবদ্য কাজ হিসেবেই দেখছেন সবাই।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন খুলনা ইউনিটের দাফন কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়ক মো: মুস্তফা আশরাফ সিদ্দিকী জানান, করোনা মহামারির থাবায় বাংলাদেশসহ বিশ্ব থমকে গেছে। করোনা সংক্রমণের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেইসাথে প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। একই সাথে আরেকটি সংক্ট দেখা যায় করোনায় মারা যাওয়া মানুষের দাফন বা সৎকারে। করোনায় মৃতের স্বজনেরা তাদের মৃতদেহ ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে। মৃতদের দাফন ও সৎকার নিয়ে বাড়ছে সমস্যা ও জটিলতা। করোনায় মৃতদের নিয়ে মানুষের অমানবিক আচরণ সবোর্চ্চ পর্যায়ে পৌছে গেছে। মৃতদেহ দাফন বা সৎকারে ভয় পাচ্ছিলেন। তখন যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন ও সৎকারের কাজে এগিয়ে আসে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন খুলনার স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ।২০২০ সালের জুন থেকে শুরু করে খুলনায় করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়া মানুষের দাফন ও সৎকারে উদ্যোগী হয়ে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনটি।ইতিমধ্যেই কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন খুলনা ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় ১২২টি মৃতদেহের দাফন ও সৎকার যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে।ইতিমধ্যেই তাদের টিম খুলনায় ৭৯জন, গোপালগঞ্জে ১১জন, বাগেরহাটে তিনজন, নড়াইলে তিনজন এবং সাতক্ষীরায় চার জনসহ শতাধিক মানুষের দাফন ও সৎকার সম্পন্ন করেছেন। কোয়ান্টামের খুলনা ইউনিট অফিসের তত্ত্বাবধানে ৩০সদস্যের প্রশিক্ষিত টিম এ অঞ্চলের দাফন ও সৎকার কাজ করছে। এ সংস্থার রয়েছে করোনায় মৃত মহিলা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্যে আলাদা টিম।

তিনি আরও জানান, আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যবিধি এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইসলামী ফাউন্ডেশনের দাফন বিধি এবং সনাতন ধর্মের সৎকার রীতিনীতি মেনে কাজ করে থাকি। মহিলাদের পর্দার বিধান মেনে দাফন কাফনের জন্যে নয় সদস্যের একটি প্রশিক্ষিত মহিলা টিম রয়েছে। যারা ইতোমধ্যে ২৭টি লাশ দাফন করেছে। আর সনাতন ধর্মের মৃতদের জন্যে সৎকারে দক্ষ ছয় সদস্যের একটি টিম রয়েছে।যারা সনাতন ধর্মের সৎকার বিধিবিধান মেনে পুরো কাজটি পরিচালনা করেন। এই টিম করোনায় মৃত সনাতন ধর্মের ১১জনের সৎকার সম্পন্ন করেছে।

কোয়ান্টাম খুলনা ইউনিটের দাফন ও সৎকার টিমের সৌরভ দে জানান, করোনায় মৃতের দাফন ও সৎকার সংক্রান্ত যে কোনো প্রয়োজনে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন খুলনা শাখার ০১৭৪০-৯৩৯৯৯৯ নম্বরে যে কেউ যোগাযোগ করতে পারবেন। এছাড়াও কোয়ান্টাম ওয়েব সাইটের ঠিকানায় গিয়ে অনলাইনে দানের মাধ্যমে এই মহতী মানবিক কাজে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

কোয়ান্টাম কেন্দ্রীয় ইউনিটের দাফন ও সৎকার টিমের ইনচার্জ খন্দকার সজিবুল ইসলাম জানান, গত ২৫ বছর যাবত কোয়ান্টাম অন্যান্য মানবিক সেবা কার্যক্রমের পাশাপাশি স্বেচ্ছা দাফন কার্যক্রমও পরিচালনা করে আসছে। ২০০৪ সালে রাজশাহী থেকে কোয়ান্টামের

মানবিক কার্যক্রম শুরু হয়। তারপর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত লাশ দাফনের অভিজ্ঞতা রয়েছে কোয়ান্টামের স্বেচ্ছাসেবীদের। কিন্তু করোনায় মৃতদের দাফন ও সৎকারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা, হৃদয়বিদারক, অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোয়ান্টাম টিম নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এ মানবিক সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষিত ছয় শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী খুলনাসহ দেশের ১৮টি ইউনিট থেকে সারাদেশে করোনায় মৃত লাশের দাফন-সৎকারের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।ঢাকায় কেন্দ্রীয় ইউনিট ছাড়াও খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, দিনাজপুর, রংপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট ইউনিটের মাধ্যমে এ মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন,কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন দেশের মানুষের সহযোগীতা ও ভালোবাসা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। কোয়ান্টামের এ মানবিক সেবা কার্যক্রম শুধুই করোনা কালীনই নয়-এটি সব সময় অব্যাহত থাকবে। গরীব, অসহায় ও যাদের প্রয়োজন তাদেরকে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে কোয়ান্টাম কাজ করছে। কোয়ানটামের টিমে যে কেউ যোগ দিতে পারবেন। এমনকি কোয়ান্টামের এসব মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে বিত্তবান ও সমাজ দরদী যেকেউ সহায়তার জন্য অনুদান দিতে পারেন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন সবাইকে ভালো কাজে ও মানবিক সেবায় এগিয়ে আসার আহবান জানায়। ##