বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
পঞ্চগড়ের নৌকাডুবিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৫, নিখোঁজ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রফি ভাঙা সেই ইউএনওকে ঢাকায় বদলি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তিন ফসলি কৃষিজমি ধ্বংস করে কোন কিছু করা যাবে না বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাদৃশ্যে নানা উৎসবে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ : ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে : উপাচার্য শ্যামনগরের কাঁশিমাড়িতে বজ্রপাত প্রতিরোধে তিন কিলোমিটার রাস্তায় তালবীজ বপন রামপালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেলেন ৩ সহস্রাধিক রোগী  খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ সোসাইটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের সকলের দায়িত্ব : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী রামপাল তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রের মালামালসহ ০৬ ডাকাত গ্রেফতার

বিশেষ নিবন্ধ : শ্রাবনের চরিত্রহনণ

সংবাদদাতার নাম :
  • প্রকাশিত সময় মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট, ২০২২
  • ৬৭ পড়েছেন

ড. মোল্যা রেজাউল করিম।।

                            ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বারোমাসি বছরটি ছয়টি ঋতুতে বিভক্ত হলেও শীত ও বর্ষা সবচেয়ে প্রভাবশালী ঋতু। প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় এ দুটি ঋতুর পরিবর্তন ও উপস্থিতি অত্যন্ত প্রকটতর রুপ ধারণ করে। শীতের হাড় কনকনে ঠান্ডা ও সমকালীন মৌসুমি ফল, খাবার, ফুল-সবজি, জীবনোপকরণ শীতের মাহত্য প্রকাশে অনস্বীকার্য। শীতকালে যেনতেন উপায়ে দিনাতিপাত করা অসম্ভব ব্যাপার। অনুরূপ ভাবে আরো একটা প্রভাবশালী প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত প্রেক্ষাপটের নাম বর্ষাকাল। ঋতুচক্রে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দু’মাস বর্ষাকাল। বছরের প্রায় ৮০ শতাংশ বৃষ্টিই হয় এ ঋতুতে, তারও বেশি হয় শ্রাবণে। সেই অর্থে বর্ষাকাল মানে শ্রাবণ মাস, আর শ্রাবণ মাস মানেই বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের অগ্নিঝরা দিনগুলো যখন প্রকৃতিকে করে বিবর্ণ ও শুষ্ক এবং জনজীবনকে করে অসহনীয়, তখনই বর্ষা রিমঝিম বৃষ্টি ঝরিয়ে প্রকৃতিকে করে তোলে সজীব। বর্ষার মুষলধারার বৃষ্টিতে ভেজার জন্য তাই তৃষিত অপেক্ষাতুর প্রকৃতি থাকে উন্মুখ, অপেক্ষামান।

বাংলার প্রকৃতি ও জীবনের নানা অনুসঙ্গে বর্ষা ও শ্রাবণের উপস্থিতি ও স্তুতি স্বগৌরবে বিরাজমান। বাংলা সাহিত্যের পরেতে পরেতে আছে বর্ষার জয়োৎসব। মহাকবি কালিদাস তার প্রেয়সী যক্ষের কাছে তার বিরহী হৃদয়ের প্রেমানুরাগ প্রকাশে বর্ষার মেঘমালাকে দুত হিসেবে স্বীকার করেছিলেন। কালিদাস তাঁর অমর কাব্য ‘মেঘদূত’-এ রামগিরি পর্বতে নির্বাসিত অভিশপ্ত প্রেমিক যক্ষের প্রেমিকা বিরহের করুণ আর্তি শিল্পের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলেছেন। কালিদাসের সেই কাব্য বিশ্ব সাহিত্যে বিরল সংযোজন। রামগিরি পর্বতে বসে আষাঢ়ের প্রথম দিবসে নববর্ষার মেঘ দেখে তারই মাধ্যমে অলকাপুরীর রম্যপ্রাসাদে তার বিরহী প্রিয়ার উদ্দেশ্যে বার্তা প্রেরণ করবেন বলে মনস্থির করেন প্রেমিক যক্ষ।

শ্রাবণ ও বর্ষাকে নিয়ে যিনি কাব্য ও সাহিত্য চর্চা করেননি বাংলা সাহিত্যে এমন কবি সাহিত্যিক পাওয়া যাবে না। শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয় বিশ্ব সাহিত্যের পরিসর জুড়েই বর্ষার দাপুটে উপস্থিতি সর্বত্র।

জীবন ও প্রকৃতির অনিবার্য প্রাসঙ্গিকতা শ্রাবণের অঝোর ধারায় নিহিত। বর্ষার জলে জীবন লাভ করে নতুন নতুন রোমান্টিকতা ও জয়োল্লাস। প্রকৃতিতে জীববৈচিত্র্যের জন্যও বর্ষার প্রয়োজনিয়তা অপরিমেয়। প্রকৃতির মাঝে বিভিন্ন প্রজাতির বেঁচে থাকা, খাদ্য শৃঙ্খল সুরক্ষা, প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, বিচরণ ও বিস্তারণের জন্য বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টির কোন বিকল্প নেই।

আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। বর্ষার ভারী বর্ষণে শরীর ধুয়ে নেয় প্রকৃতি। পরিচ্ছন্ন হয়, নতুন করে জেগে ওঠে। বেলী, বকুল, জুঁই, সঠি, দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনার ঘ্রাণে ভরে ওঠে চারপাশ। আর ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’-এর হাসি তো ভুবন ভোলানো! কী গ্রাম, কী নগর, সর্বত্রই বর্ষার আগমনীবার্তা দেয় কদম। যেন সেই কথার জানান দিতেই পেখম মেলে ময়ূর। বৃষ্টির জল গায়ে নিয়ে নৃত্য করে তারা। বাঙালি মননে সবচেয়ে বেশি রোমান্টিকতা-আধ্যাত্মিকতার সুর বেজেছে বর্ষায়, শ্রাবণে ও তার আবেগে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ, পল্লীকবি জসিম উদ্দিন সহ সকল কবি সাহিত্যিক বর্ষা ঋতুকে নিয়ে, শ্রাবণকে নিয়ে অসংখ্য কবিতা, গল্প, গান লিখেছেন। তাই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষাঋতু, শ্রাবণ এবং ঝরঝর বৃষ্টিকে তার কবিতায় সাজিয়েছেন বিচিত্রভাবে। বর্ষা কখনো প্রকৃতির রূপ বর্ণনার, কখনো নিরেট প্রেমের অনুঘটক, আবার কখনো বা বর্ষা স্বয়ং নারী, রুপবতি, প্রেয়সী।

কৃষি নির্ভর অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। এখানকার কৃষক সহ সকলের ব্যপক নির্ভরতা শ্রাবণের বৃষ্টির প্রতি। বিশেষ করে আমন ধান চাষাবাদের প্রায় সবটুকুই শ্রাবণের বৃষ্টি কেন্দ্রীক। ব্যবসা বানিজ্যের জন্যও শ্রাবণের বৃষ্টির রয়েছে প্রাসঙ্গিকতা। বৃষ্টিতে দুকূল ছাপিয়ে টইটম্বুর হয়ে ওঠে আমার নদী ও যৌবনবতী হয় খালবিল। ভরা যৌবনা নদী ও খালে নৌকায় করেই মালামাল পরিবহন ও বানিজ্য জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ করে নতুন মাত্রা।

বৃষ্টি গ্রামীন জনপদে জীবনের স্বাচ্ছন্দ ও উৎকর্ষতা আনয়ন করে। তাপদাহে ক্লিষ্ট মানুষের জন্য স্বস্তির পরশ জোগায় বৃষ্টির কুলকুল ধ্বনি। বৃষ্টির গানে প্রাণ ফিরে পায় ঘর্মক্লান্ত কৃষক। মাছের প্রজনন হয় শ্রাবণে, মানুষের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রয়োজন মিটাতে জলাভূমিতে সৃষ্টি হয় মাছের প্রাচুর্য।

শ্রাবনের বারিধারা ব্যাকুল করে মনুষ্য হৃদয়। বিরহী ব্যাকুল প্রকৃতির কাছে তখন বাঙময় হয়ে ওঠে জীবনের বৈচিত্র্যময়তা, প্রকৃতি মানুষকে ডাকে জীবনের গূঢ়তর টানে, শরীরের মতই ভিজিয়ে দিয়ে চাঙা করে দেয় দেহ-মন।

এই বর্ষায় গ্রামের বধূরাও মাতেন রহস্য-কথা আর কেচ্ছা-কাহিনিতে। ঘরে ঘরে চাল আর শিমের বিচি ভাজা হয়। গ্রামেগঞ্জে রাতজুড়ে চলে কীর্তন আর পালাগান। বাড়ির ঝিয়েরা সুই-সুঁতো নিয়ে গল্পে গল্পে মেতে উঠেন নকশীকাঁথা সেলাইয়ে। ছোটদের মধ্যে ধুম পড়ে সাপ-লুডু আর পুতুল খেলার। সব মিলে মন কেমন করা এই বর্ষা ঋতু মানুষের জীবনে নতুন এক রোমান্টিক আবহ নিয়ে আসে। তাই হয়তো হৃদয় ছোঁয়া বৃষ্টিকে যুগে যুগে রোমান্টিক ভাব-ভাবনা আর প্রেমিক মনের আর্তি-বেদনার সঙ্গে কল্পনা করেন কবি-শিল্পীরা-ভাবুকেরা।

তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনে প্রকৃতির সে রূপ এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না। শ্রাবণের সেই চিরচেনা মুষলধারে বৃষ্টি, কুলকুল ধ্বনিতে টিনের চালে বৃষ্টির নিক্কণ ছন্দ, যৌবনবতী খাল-বিল-নদী আর সহজে দেখা মেলে না শ্রাবণে। বর্ষপরিক্রমায় বর্ষার সেই উপস্থিতি এখন নেই শ্রাবণে।

শ্রাবণ হারিয়েছে তার স্বমহিমা, নিজস্বতা ও চরিত্র। শ্রাবণ মানেই সেই কলকল জলরাশীর নান্দনিকতা, ঝরঝর মুষলধারের বৃষ্টি, আকাশ ভাঙ্গা মেঘের ভেলা, কালো অন্ধকারে ঢাকা দিনের আকাশ, মেঘগর্জন, স্রোতস্বীনি নদী খাল, কানায় কানায় পরিপূর্ণ জলাশয়, গ্রামীণ জনপদে কর্দমাক্ততা, ছাতা মাথায় পথচলা, টিনের চালে ছান্দসিক বৃষ্টির সুর, প্রজনন উদ্যোমে উম্মাদনায় স্নিগ্ধ মৎস্যকূল, নানান পাখি ও প্রানীদের বৈচিত্র্যময়তা হারিয়ে রুক্ষতার এক কাঠিন্যে রূপায়িত হয়েছে চিরচেনা মুষলধারের সেই শ্রাবণ। ##

লেখক :  পরিচালক, বাংলাদেশ ফরেষ্ট একাডেমী, চট্টগ্রাম।

সংবাদটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করা হলো

এ ধরনের আরো সংবাদ

© All rights reserved by www.banglardinkal.com (Established in 2017)

Hwowlljksf788wf-Iu