বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
পঞ্চগড়ের নৌকাডুবিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৫, নিখোঁজ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রফি ভাঙা সেই ইউএনওকে ঢাকায় বদলি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তিন ফসলি কৃষিজমি ধ্বংস করে কোন কিছু করা যাবে না বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাদৃশ্যে নানা উৎসবে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ : ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে : উপাচার্য শ্যামনগরের কাঁশিমাড়িতে বজ্রপাত প্রতিরোধে তিন কিলোমিটার রাস্তায় তালবীজ বপন রামপালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেলেন ৩ সহস্রাধিক রোগী  খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ সোসাইটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের সকলের দায়িত্ব : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী রামপাল তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রের মালামালসহ ০৬ ডাকাত গ্রেফতার

বাগেরহাটে সরকারের শিক্ষা কর্মসূচির ৩৬ কোটি টাকা এনজিও সুখী মানুষ এবং সহকারী পরিচালকের যোগসাজসে  আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি।।
  • প্রকাশিত সময় মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ৫২ পড়েছেন
  • সদরে ঝরেপড়া শিশু ১,৮৫৬ জনের স্থলে মাত্র ৩৯ জন :

    ##   বাগেরহাট জেলার ৮টি উপজেলায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় আউট অব স্কুল এডুকেশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে নিয়োজিত এনজিও সুখী মানুষ-এর বিরুদ্ধে বাস্তবে তেমন কোন কাজ না করেই জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রকল্পের সম্পূর্ন ৩৬ কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারী এ বিপুল পরিমান অর্থ আতœসাতে খোদ সরকারের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বাগেরহাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক হুমায়ুন সরদার সরাসরি সহযোগীতা করছেন। ফলে দেশ থেকে নিরক্ষরতামুক্তকরন শিক্ষা কার্যক্রমের সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ ধ্বংস হতে চলেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় সুশীল সমাজ ও শিক্ষা সেক্টরে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিরা তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে দ্রæত তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানিয়েছেন।
    বাগেরহাটের উপানুষ্টানিক শিক্ষ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)-এর আউট-অব-স্কুল চিলড্রেন কর্মসূচি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে সারা দেশে চলমান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাগেরহাট জেলার আটটি উপজেলার ঝড়ে পড়া শিশুদের জন্য চালু করা হয় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম। “সুখী মানুষ” নামক বেসরকারী সংস্থা বাগেরহাট জেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য লিড এনজিও হিসেবে নির্বাচিত হয়। সুখী মানুষ লিড এনজিও-এর দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকেই নানা ধরনের অনিয়মের মধ্যে দিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, কর্মসূচিতে বাগেরহাট সদর উপজেলায় ৭০ টি, মোল্লাহাটে ৭০টি, চিতলমারী ৭৯টি, ফকিরহাট ৬৬ টি, রামপাল ৬৫ টি, মোংলায় ৭০ টি, কচুয়ায় ৬৫ ও মোড়েলগঞ্জে ৭০ টি মোট ৫৫৫ টি কেন্দ্র চালুর কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বাস্তবে শিক্ষা কেন্দ্র পাওয়া গেছে অনেক কম। প্রতিটি কেন্দ্রে ৩০জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আছে অর্ধেকেরও কম। আবার যাও আছে তার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই লক্ষিত জনগোষ্ঠীর (টার্গেট পিপল) নয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যেই অধ্যায়ন করছে। এমন শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় ভর্তি করার কোন বিধান নেই। শিক্ষা কেন্দ্রের জন্য ঘর ভাড়া নেয়ার বিধান থাকলেও শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন মানুষের বারান্দায়, গোয়াল ঘরে, রান্না ঘর ও মুরগীর ফার্মে চলছে ক্লাস। শিক্ষা কেন্দ্র ডেকোরেশনের জন্য প্রতিটা কেন্দ্রে ৫০০ টাকা (ফলের চার্ট, বর্নমালার চার্ট, বিভিন্ন ব্যক্তিদের ছবি, অন্যান্য আকর্ষনীয় চার্ট) থাকার কথা থাকলেও কোন কেন্দ্রে তা লক্ষ্য করা যায়নি। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনায় উৎসাহিত করার জন্য স্কুলের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রতি মাসে ১২০ টাকা করে উপবৃত্তির বরাদ্দ রয়েছে। যার একটি টাকাও কোন শিক্ষার্থী পায় নাই। প্রতিটা কেন্দ্রে ২৪০ বর্গফুটের ফ্লোর ম্যাট দেওয়ার কথা থাকলেও নাম মাত্র ২/৩ টা প্লাস্টিকের মাদুর ব্যবহার করা হয়। প্রতিটা কেন্দ্রে ৩হাজার টাকা বাজেটের মধ্যে ফ্যান থাকার কথা থাকলেও কোন কেন্দ্রেই ফ্যান পাওয়া যায়নি। স্কুল ভাড়া ছাড়াও টিউব লাইট, পানির জার, স্টিলের ট্রাঙ্ক, জাতীয় পতাকা, সাইনবোর্ড, হাতলওয়ালা চেয়ার, টুল, স্কুল ব্যাগ, স্কুল ড্রেস, শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড, টিচিং এইড এবং গেমস উপকরণ দেওয়ার কথা থাকলেও যে সকল কেন্দ্র গুলোতে ক্লাস চলছে সে সকল কেন্দ্রে এসব কোনটাই দেখা যায়নি। সদর উপজেলায় ৭০টি কেন্দ্র চালু করার কথা থাকলেও বাস্তবের সাথে কোন মিল নাই। সদর উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর তালিকা করার কথা হলেও বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। তালিকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী আছেন যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী যা সম্পূর্ন বে-আইনী। তেমনি তালিকাতে যে সকল শিক্ষার্থীদের নাম আছে তার অধিকাংশ শিক্ষার্থীদেরই বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। এভাবেই প্রতারনা করছে এনজিও সুখী মানুষ।
    উপানুষ্টানিক শিক্ষ অধিদপ্তর ও মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এনজিও সুখী মানুষ সংস্থার অনৈতিক কাজে উপানুষ্টানিক শিক্ষ অধিদপ্তরের পূর্ববর্তী সহকারী পরিচালকগণ সহযোগিতা না করায় তাদের বদলী করে মুন্সীগঞ্জ জেলা থেকে হুমায়ুন সরদার নামে একজন বিতর্কিত সহকারী পরিচালককে বাগেরহাট জেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বে আনা হয়। এই কর্মকর্তা সুখী মানুষ সংস্থার নির্বাহী পরিচালকের পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্টজন বলে জানা গেছে। বাগেরহাট জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাথের পরিকল্পনা ও পরামর্শ তিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে দিতেন এবং এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য পূর্ববর্তী দুজন সহকারী পরিচালকের উপর প্রভাব বিস্তারসহ ফোনে চাপ সৃষ্টি করতেন। তিনি বাগেরহাটে যোগদান করার সাথে সাথে সুখী মানুষ এনজিওর পূর্বের সকল অনিয়মকে বৈধতা দিয়ে অর্থ ছাড়করণে মরিয়া হয়ে উঠেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে সুখী মানুষ এনজিওর অর্থ ছাড় বন্ধ রাখার আদেশ থাকলেও গত জুন মাসে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের আদেশ অমান্য করে হুমায়ুন কবির সরদার সুকৌশলে একাউন্ট্যান্ট জেনারেল(এজি) অফিস থেকে বিপুল পরিমান অর্থ উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসন বিষয়টি জানতে পেরে বিলটি অনুমোদন করেননি। এছাড়া বাগেরহাট সদর, চিতলমারী, মোল্লাহাট, ফকিরহাট ও কচুয়া উপজেলায় কাগজে কলমে প্রকল্পের স্কুল চালু করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সেখানে সঠিক শিক্ষাথী নেই। এ সকল বিষয়ে যাচাই করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের উপর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। পরে বাগেরহাট জেলার জেলা প্রশাসক গত ৭সেপ্টেম্বর-২০২২ তারিখ ৪০৯ নম্বর স্মারকে কমিটি গঠন করে ইউএনওদের চিঠি দিয়েছেন। ফলে এনজিও সুখী মানুষ কর্তৃপক্ষ এবং উপানুষ্টানিক শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির সরদার এনজিও সুখী মানুষ-এর পক্ষে প্রতিবেদন পেতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার জন্য যোগাযোগসহ ভিত্তিহীন বিভিন্ন চিঠিপত্র লিখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
    এবিষয়ে বাগেরহাট সদর উপজেলার রিপোর্টের সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলায় ঝরেপড়া শিক্ষার্থী আছে মাত্র ৩৯জন। অথচ এনজিও সুখী মানুষ এবং উপানুষ্টানিক শিক্ষার সহকারী পরিচালক যোগসাজসে সদর উপজেলায় ১হাজার ৮৫৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছে। একইভাবে ফকিরহাট উপজেলায় ১হাজার ৭৭৭ জন, মোল্লাহাট উপজেলায় ২হাজার ১০০ জন এবং চিতলমারী উপজেলায় ২হাজার ৫২৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছে দাবী করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের পায়তারা করছে সহকারী পরিচালক হুমাউন কবির সরদার। বাগেরহাট উপানুষ্টানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির সরদার হুমায়ুন সরদার যোগদান করার মাত্র ছয় কর্মদিবসের মধ্যে ১৮জুন-২০২২ তারিখে মাত্র এক দিনের পরিদর্শনে প্রায় তিনশত পাঠদান কেন্দ্র এবং ৮হাজার ২৬২ জন শিক্ষার্থী সব সঠিক আছে বলে ১৯জুন-২০২২ তারিখে ৮৪ নম্বর পত্রে প্রতিবেদন দিয়েছেন। এ সময়কালে তিনি একই সাথে ৩টি জেলার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সে হিসেবে ১৮জুন-২০২২ তারিখ পর্যন্ত বাগেরহাট জেলায় তার কর্মদিবস হয় মাত্র দুই দিন। কাজেই এক বা দুইদিনে কোনভাবেই ৩০০স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন সম্ভব নয়। তদুপোরি সহকারী পরিচালক সবকিছু ঠিক আছে প্রতিবেদন দেওয়ায় জেলা ও উপজেলার কর্মকর্তা এবং স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।
    এ বিষয়ে সুখী মানুষ এনজিও’র সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজারসহ সংস্থার বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সংস্থাটি ঊর্ধ্বত্বন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের জন্য নামমাত্র কয়েকটি স্কুল স্থাপন করেছে। পরিদর্শনের আগেই খবর মোবাইলে জানানো হয় এবং শিক্ষিকারা আশপাশের বাড়ির স্কুল পড়ৃয়া ছেলেমেয়েদের জড়ো করে স্কুল পরিচালনা দেখান। পরিদর্শক ফিরে গেলে পাঠদান কেন্দ্রে আসা সব ছেলেমেয়েরা সকলেই বাড়ি চলে যায় বলে প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। তবে শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকল্প কর্মকর্তা হুমায়ুন সরদার ও সুখী মানুষ সংস্থার নির্বাহী পরিচালকের নির্দেশনার বাইরে তাদের কিছু করনীয় নেই বলেও জানান তারা।
    অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মোড়েলগঞ্জ, রামপাল ও মোংলা উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সহযোগী এনজিও প্রতিভা সংস্থা এবং সিডোপ সংস্থা শিক্ষার্থী জরিপ করে স্কুল চালু করার প্রস্তুতি নিলেও অজ্ঞাত কারনে তাদেরকে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা দপ্তরের সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির সরদার মোটা অংকের অর্থ দাবী করেছেন বলে অভিযোগ করেছে ঐ দুই এনজিও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। এমনকি কর্মকর্তা কর্মচারীদের অবৈধ নিয়োগ অনুমোদন, প্রায় একবছর আগের পিছনের তারিখ দেখিয়ে অবৈধভাবে কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়োগ বাতিল ও অনুমোদন এবং শোকজ ও প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিকট থেকে অর্থ দাবীর বিষয়ে সহকারী পরিচালক হুমায়ুন সরদারের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সহকারী পরিচালক হুমায়ুন সরদারের বিরুদ্ধে এরআগেও নারী কেলেংকারীসহ নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যার কারনে শাস্তি স্বরূপ তার দুটি ইনক্রিমেন্ট কর্তন করেছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে এ ধরনের একজন অসৎ ও বিতর্কিত কর্মকর্তাকে মুন্সীগঞ্জ থেকে বাগেরহাটে দায়িত্ব প্রদান করায় জনমনে নানাবিধ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে গুন্জন রয়েছে, সহকারী পরিচালক হুমায়ুন সরদারের চাকরি আছে মাত্র এক মাস। এরমধ্যে যেভাবেই হোক তিনি একটি বিরাট অংকের অর্থ উত্তোলন করে অবসরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সে কারনে তিনি তার মূল কর্মস্থলে না গিয়ে সব সময় বাগেরহাট থাকছেন। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ দিবস গত ৮সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবসেও তিনি তার মূল কর্মস্থলে যাননি।
    অন্যদিকে, এনজিও সুখী মানুষ সংস্থার বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট তথ্য গোপন করে শিক্ষক নিয়োগ কমিটির বৈধ সদস্য সচিব ব্যতীত সকল উপজেলায় বিধি বহির্ভূতভাবে শিক্ষক নিয়োগ, বৈধ শিক্ষার্থী জরিপ ব্যতীত শিক্ষক তালিকা তৈরী, ক্যাম্পেইন কমিটির সভাপতি প্রধান শিক্ষকের অনুমোদন ব্যতীত শিক্ষার্থীদের ভূয়া তালিকা প্রস্তুত করা, কর্মীদের বেতন ভাতা না দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ জামানতের নামে কর্মীদের নিকট থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায়, ব্যাংক জালিয়াতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে এসোসিয়েট এনজিও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে এনজিও সুখী মানুষ সংস্থা কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাদের সাথে প্রতারনা করেছে বলেও অভিযোগ করেছে বেশ কয়েকটি এনজিও। পার্টনার নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে ছায়া কুঞ্জ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি ও শাপলাফুল সমাজ উন্নয়ন সংস্থা নামক দুটি সংস্থা এনজিও সুখী মানুষ-এর বিরুদ্ধে প্রতারনার মামলাও দায়ের করেছেন। এছাড়া রামপাল ও মোংলা উপজেলায় সিডোপ, কচুয়া উপজেলায় নিকেতন সেবা সংস্থা এবং মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় প্রতিভা সংস্থার সাথে এসোসিয়েট এনজিও হিসেবে চুক্তি করার পর হঠাৎ করেই মিথ্যা অজুহাতে চুক্তির শর্ত সম্পুর্ণ লঙ্ঘন করে এসোসিয়েট এনজিও’র চুক্তি বাতিল এবং মোটা অংকের লেনদেনের বিনিময়ে নতুন করে এসোসিয়েট এনজিও নিয়োগ করার অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর অনুমোদন নেয়ার বিধান থাকলেও তা করা হয়নি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে সুখী মানুষ এনজিও’র সব অনিয়ম-দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে দাবী করেছেন সহযোগী এনজিও’র প্রতিনিধিরা। এসব বিষয়ে ‘সিটিজেন ভয়েস’ নামে একটি সংগঠনের অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
    এনজিও সুখী মানুষ সংস্থার শিক্ষা কেন্দ্রে কর্মরত শিক্ষক সুমি আক্তার জানান, ঝরেপড়া শিশুদেও শিক্ষাদান প্রকল্পের শুরু থেকেই শিক্ষক হিসাবে নিয়োজিত আছি। কিন্তু এনজিও সুখী মানুষ কর্তৃপক্ষ আজও পর্যন্ত আমাদের কোন বেতন-ভাতা দেয়নি। কেন্দ্র পরিচালনার জন্য কোন ঘর ভাড়া না দেয়ায় বাড়ীর মালিক ঘরে তালা দিয়ে দিয়েছে। সেজন্য বর্তমানে পাঠদান কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ঘরের মালিকের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রগ্রাম অফিসার মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, ২০২১ সালে আমার নিয়োগ হয় কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন বেতন-ভাতা পায়নি। শিক্ষা কেন্দ্রের জন্য যে সকল ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম সে ঘরের ভাড়া পরিশোধ না করায় মালিকরা ঘরে তালা দিয়ে দিয়েছে। তাদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার শিক্ষকরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এখন আমাদের চাকুরীচুত করার জন্য সহকারী পরিচালক হুমায়ুন সরদার এবং এনজিও সুখি মানুষের নির্বাহী পরিচালক উঠে পড়ে লেগেছে।
    সহযোগী এনজিও নিকেতন সমাজ কল্যান সংস্থার চেয়ারম্যান ইউনুছ শিকদার জানান, নির্দিষ্ট সময়ের ৯মাস পরে গত ৩১ আগষ্ট-২০২২ তারিখ কচুয়ায় কেন্দ্র উদ্বোধন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যনসহ এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। আশাকরি সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে কেন্দ্র চালু করতে পারব। শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীর তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ মাসের শেষের দিকে পাওয়া যাবে। এবিষয়ে কচুয়ার টেংরাখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ৩১আগষ্ট আমার বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরকে ঐ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী দেখিয়ে ঝরেপড়া শিক্ষা কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়েছিল। যা মোটেই সমীচিন নয়। আমার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে তারা ঝরেপড়া দেখিয়ে সরকারের বিপুল পরিমান টাকা লুটপাট করছে।
    বাগেরহাটের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হুমাউন কবির সরদার বলেন, এনজিও সুখী মানুষের সাথে যোগসাজসে সরকারী অর্থ আতœসাতের অভিযোগ সঠিক নয়। তবে ঝরেপড়া শিশুদের শিক্ষা কেন্দ্রের কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ঘরভাড়া না দেওয়ার কারনে ঘর মালিকেরা তালা দিয়ে দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমার নিজের পকেট থেকে কয়েক জন মালিকে ঘর ভাড়া দিয়ে দিয়েছি। ঘরভাড়া না দেওয়ার বিষয়টা শুধু বাগেরহাটের না সারা বাংলাদেশের একই অবস্থা। জেলা ও উপজেলা থেকে মনিটোরিং ও ভেরিভিকেশন রির্পোট গেলে তারপর অর্থ ছাড় হবে। ভেরিভিকেশন রির্পোট বিলম্ব হওয়ায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে ঝরেপড়া শিশুদের মিথ্যা তথ্য, সহযোগী এনজিও নিয়োগ, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম ও প্রতারনা, নিয়োগকৃতদেও বেতন-ভাতা না দিয়ে চাকুরীচ্যুত কওে আবারও অন্যদেও নিয়োগ দেয়া এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাঠদান কেন্দ্র না করে ভুয়া কেন্দ্রের ও শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারের বিপুল পরিমান অর্থ আতœসাতের চেষ্টার বিষয়ে কোন উত্তর দিতে তিনি রাজি হননি। এছাড়াও মাত্র এক বা দুইদিনে বাগেরহাটের ৩০০পাঠদান কেন্দ্র পরিদর্শন করে ৮হাজারের অধিক সঠিক আছে এমন প্রতিবেদন দেয়ার বিষয়েও তিনি কোন সদুত্তোর দিতে পারেননি। তবে তিনি সরকারের ঝরেপড়া শিশুদের শিক্ষাদান কার্যক্রমকে এিেগয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানান।
    বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মোসাব্বেরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি সরকারের উপানুষ্টানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় বাগেরহাটে ঝরেপড়া শিশুদের শিক্ষাদান কার্যক্রমে নিয়োজিত এনজিও সুখী মানুষ সংস্থার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দূর্নীতি ও প্রতারনার বিষয়ে আমাদের কাছে কিছু অভিযোগ আসলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তদন্তের জন্য নির্দেশনা পায়। বিষয়টি আমরা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সহায়তায় সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের মাধ্যমে তদন্ত করিয়েছি। একই সাথে শিক্ষার্থীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে দেখেছি। এনজিও সুখী মানুষ সংস্থার তালিকা অনুযায়ী শিশুদের এসব কেন্দ্রে যতজন ঝরেপড়া শিক্ষার্থী থাকার কথা তার চেয়ে অনেক কম ছেলে-মেয়ে রয়েছে। সুখী মানুষ এনজিও আমাদের ১হাজার ৮৫৬ জনের শিক্ষার্থীর একটা তালিকা দিয়েছে। এরমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। এছাড়া কেন্দ্রের আশপাশের এফতেদায়ী মাদ্রাসায় পড়ে এমন কিছ’ শিক্ষার্থী এবং কিছু ১৪ বছরের উপরে বয়সের রয়েছে। আবার ৮বছরের কম বয়েসের শিক্ষার্থীও রয়েছে। দেখা গেছে, এনজিও সুখী মানুষ সংস্থার দেয়া তালিকা মোতাবেক বিশাল অংকের শিক্ষার্থী এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষা গ্রহন করার উপযুক্ত নয়। সুখী মানুষ এনজিও দেওয়া তালিকায় সদর উপজেলায় ১হাজার ৮৫৬ জনের স্থলে মাত্র ৩৯ জনের একটি তালিকা আমাদের প্রথমিক শিক্ষা দপ্তর থেকে পেয়েছি যারা এই প্রকল্পের উপযুক্ত শিক্ষার্থী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া অনেক স্থানে পাঠদান কেন্দ্র প্রতিষ্টার কথা বলা হলেও সেখানে কোন পাঠদান কেন্দ্রই নেই। এ ধরনের অসত্য ও প্রতারণামূলক তথ্য দিয়ে সরকারের একটি মহৎ প্রকল্পকে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ম ও প্রতারনার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলেও তিনি জানান।
    এদিকে, অনিয়ম-দূর্নীতি ও প্রতারনার অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আউট অব স্কুল চিলড্রেন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়োজিত এনজিও সুখী মানুষ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নাফিজা আফরোজ বর্নোর সাথে একাধিকবার ০১৭১২৫৫৫৭৮৮ এই নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।
    তবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মু: নূরুজ্জামান শরীফ জানান, এনজিও সুখী মানুষ-এর বিষয়ে অনেক অভিযোগ এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং এ বিষয়ে মন্ত্রনালয় ব্যবস্থা নেবেন। প্রকল্পের টাকা ছাড় করার বিষয়ে বাগেরহাটের সহকারী পরিচালকের কোন ক্ষমতা নেই। টাকা ছাড় একমাত্র উপানুষ্টানিক শিক্ষা ব্যুরো থেকে করা হবে। তাদের বিষয়ে সব উপজেলায় না হলেও বেশীরভাগ স্থানে অভিযোগ রয়েছে। সে বিষয়ে সঠিক প্রতিবেদন না পাওয়া গেলে এক টাকাও ছাড় দেয়া হবে না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একটি প্রতিবেদন দেবেন। শুধুই ইউএনওই না উপজেলায় ৫সদস্যের একটা কমিটি করা হয়েছে তারা প্রতিটি শিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন। তারপর জেলায়ও একটা কমিটি আছে সেখান থেকে কোন ক্লিয়ারেন্স প্রতিবেদন না দিলে আমরা এক টাকাও ছাড় করবো না বা কোন টাকা ছাড় করার সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান।
    সংশ্লিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উৎকোচ প্রদান, ক্ষমতার প্রভাব, টেন্ডার ডকুমেন্ট ও চুক্তিপত্রে ব্যাংক হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকল্পের ৩৬ কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিয়েছে “সুখী মানুষ”। এসব ক্ষেত্রে কার্যাদেশ বাতিলের বিধান থাকলেও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো “সুখী মানুষ”-এর ব্যাংক হিসাব জালিয়াতির তথ্য পেয়েও রহস্যজনক কারনে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। স্থানীয়রা বলছেন, এনজিও সুখী মানুষ-এর অনৈতিক, নিয়মবর্হিভুত ও চরম অনিয়ম- দূর্নীতি এবং প্রতারনার কারনে সরকারের শিক্ষিত জাতি গঠনের একটি দৃষ্টান্তমূলক কর্মসূচী ব্যর্থ হতে চলেছে। যা ঝরেপড়া শিশুদের শিক্ষার পরিবর্তে সরকারের প্রতি বিরুপ মনোভাব সৃষ্টি এবং শিক্ষা বিমুখ করে তুলছে। দ্রæত তদন্ত শেষ করে এনজিও সুখী মানুষ-এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে ঝরেপড়া শিশুদের শিক্ষার্জন কর্মসূচী যথাযথ বাস্তবায়নের দাবীও জানান তারা। ##

সংবাদটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করা হলো

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ ধরনের আরো সংবাদ

© All rights reserved by www.banglardinkal.com (Established in 2017)

Hwowlljksf788wf-Iu