উপকূলে কৃষকদের আশা জাগাচ্ছে মৃত্তিকার গবেষকরা

84

খুলনা ব্যুরো।।

খুলনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের লবনাক্ততা ও পানি সংকট মোকাবেলা করে পতিত জমিতে চাষাবাদের ভিত্তি রচনা করেছেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউটের গবেষকরা। গত কয়েক বছরে গবেষনার মাধ্যমে লবন ও খরা সহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের ফসল চাষাবাদের প্রযুক্তি ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করে মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক চাষে সফলতাও পেয়েছেন মৃত্তিকার গবেষকরা।ইতিমধ্যেই গবেষনার মাধ্যমে উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যবহার করে তরমুজ, ধান, ভুট্টাসহ উচ্চ অর্থকরী ফসল এবং কুমড়া, ঢেড়শসহ বিভিন্ন প্রকার সজ্বি চাষ কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। তাদের উদ্ভাবিত ডিবলিং, চারা উৎপাদন ও সিজলিংসহ একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করে খুলনাসহ উপকুলীয় অঞ্চলের পতিত দেড় সহস্রাধিক হেক্টর জমিতে সফলভাবে চাষাবাদের আওতায় সক্ষম হয়েছেন তারা।এতে পড়ে থাকা ৬’সহস্রাধিক হেক্টর পতিত জমিতে চাষাবাদের আশা জেগেছে উপকুলীয় অঞ্চলের কৃষকদের।

কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর ও মৃত্তিকা উন্নয়ণ ইনষ্টিটিউটের সূত্রে জানা গেছে, খুলনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে জমি এক ফসলী হওয়ার কারনে গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে ৬’হাজার হেক্টরেরও বেশী জমি পতিত থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবনাক্ততা, সেচ ও পানি সংকটের কারনে এসব জমিতে কোন ফসল হয় না। এসব জমিকে আবাদের আওতায় আনতে ২০১৮ সালে কৃষি মন্ত্রনালয়ের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউটের গবেষকরা একটি প্রকল্প হাতে নেয়। উপকুলীয় খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট-গোপালগঞ্জ ও পিরোজপুর জেলার ৩৯টি উপজেলায় এ প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষনা শুরু করেন। সরকারের কৃষি মন্ত্রনালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের আওতায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউট বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ জেলার সদর, কাশিয়ানী, কোটালীপাড়া, মুকসুদপুর ও টুঙ্গীপাড়া, খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার সদর, ফকিরহাট, মোল্রাহাট, রামপাল, মোংলা, কচুয়া, চিতলমারী, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা, খুলনার মেট্রোপলিটন ও লবনচরা থানা এবং দাকোপ, কয়রা,ফুলতলা, দিঘলিয়া, রূপসা, বটিয়াঘাটা, তেরখাদা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া উপজেলা, সাতক্ষীরা জেলার সদর, কলারোয়া, শ্যামনগর, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, তালা ও আশাশুনি উপজেলা এবং পিরোজপুর জেলার সদর, নেছারাবাদ, মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া, ইন্দুরকানি, নাজিরপুর ও কাউখালী উপজেলার পতিত জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে মৃত্তিকা সম্পদ ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা একযোগে কাজ করছেন।গত ২/৩বছর ধরে গবেষনা করে এ প্রকল্পের আওতায় উপকুলীয় এলাকার মাটি, পানি পরীক্ষা ও গবেষনায় বেশ কিছু চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। ধারাবাহিক গবেষনায় মৃত্তিকা গবেষকরা লবনাক্ততা ও খরাপ্রবন মাটিতে চাষাবাদের উপযোগী পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। উপকূলীয় অঞ্চলের পতিত জমি চাষাবাদে গবেষকদের উদ্ভাবিত ডিবলিং, ট্রান্সপ্লানিটং, পরিব্যাগ ও ট্রেতে চারা উৎপাদন ও এবং পলিমাসসহ একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তরমুজ, ধান, ভুট্টা এবং কুমড়া, ঢেড়শসহ বিভিন্ন প্রকার সজ্বি চাষে সফলতা এসেছে। ইতিমধ্যেই খুলনাসহ উপকুলীয় অঞ্চলের পতিত দেড় সহস্রাধিক হেক্টর জমিতে সফলভাবে চাষাবাদের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছেন তারা। এতে এলাকার কৃষকরা লাভবান হওয়ায় বেড়েছে আগ্রহ ও আবাদের পরিধিও।

বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারামপুর গ্রামের কৃষক সৈকত রায় জানান, তাদের এলাকায় বছরে একটি মাত্র ফসল উৎপাদিত হত।এরপর পানির অভাবের কারনে আর কোন ফসল হতো না। কিন্তু মৃত্তিকার লোকজন ২/৩বছর ধরে আমাদেরকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে এবং সার-বীজের সহযোগীতা দেওয়ায় এখন ধান চাষ করছি। তাতে ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। এ বছর ৪বিঘা জমিতে ধান চাষ করে প্রায় ৭০হাজার টাকা লাভ হয়েছে। এটা ধরে রাখা গেলে কৃষকরা উপকৃত হবে।

দেবীতলা গ্রামের শাহজাহান আলী, ২’একর তরমুজ করেছিলেন মৃত্তিকার অফিসারদের পরামর্শ ও সহযোগীতা নিয়ে।তিনি জানান, তরমুজের ফলন খুবই ভালো হয়েছিল। স্যারদের কথামত চাষ করায় ঝড়-বৃষ্টির আগেই ফসল তুলতে পারায় অনেক বেশী লাভবান হয়েছেণ।একই কথা জানান ওই গ্রামের রহিমা খাতুন ও শুকুর আলী।তারাও প্রায় তিন হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলেন।

দেবীতলা গ্রামের ভুট্টা চাষী বনষ্পতি রায় ও অংশুমান রায় জানান, তারা মৃত্তিকার লোকজনের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নিয়ে গত দুই বছর ভুট্টা চাষ করছেন।পানির সংকট ও লবনাক্ততার কারনে এসব জমিতে আগে কখনও শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ হয়নি। স্যারদের সহযোগীতা নিয়ে ভুট্টা চাষ করে অনেক বেশী লাভবান হচ্ছি। ইতিমধ্যেই এলাকার শতাধিক চাষী এ মৌসুমে ধান, ভুট্টা, তরমুজ এবং বিভিন্ন প্রকার শাকসজ্বি চাষও করেছেন। ফলে এই মৌসুমে ফসল উৎপাদন হওয়ায় কৃষকের ঘরে স্বাচ্ছন্দ ফিরে এসেছে।তবে স্থানীয় ভাবে ভরাট হয়ে যাওয়া খাল ও নদীনালাগুলো খনন করে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে খরা মৌসুমে ব্যাপকহারে চাষাবাদের সম্ভবনা রয়েছে বলে দাবী তাদের।একইভাবে এ প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাট, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ এবং সাতক্ষীরায়ও মৃত্তিকার গবেষকদের পদ্ধতি প্রয়োগ করে চাষাবাদে অনেক সফলতা পেয়েছেন কৃষকরা।

খুলনা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ণ ইনষ্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষক অমর কান্তি বিশ্বাস জানান, প্রকল্পের শুরুতে মাটি ও পানি নিয়ে গবেষনা শুরু করা হয়। পরে লবনাক্ততা ও খরা সহিষ্ণু ফসল চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্বাবনের কাজ করা হয়। প্রাথমিকবাবে নিজস্ব খামারে পদ্ধতিগুরোর গবেষনায় সফলতা আসায় পরে কৃষকের ামঝে সম্প্রসারণে কাজ করা হচ্ছে। তাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিসমূহ ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ, সার,বীজসহ সার্বিক সহযোগীতা করছেন। এতে লবনাক্ত ও খরা প্রবন জমিতে চাষাবাদে আশাবাদি হয়ে উঠেছে এলাকার কৃষক। শুধুমাত্র খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, পাইকগাছা, কয়রাসহ ৯টি উপজেলায় এক হাজার ৭০০হেক্টর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে। এটি আমাদের কৃষির জন্য একটি ইতিবাচক দিক বলে মনে করেন এই গবেষক।

তবে এ প্রকল্পের আওতায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও পদ্ধতিসমূহ মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা গেলে জমির স্বাস্থ্য ভালো রাখা, রোগবালাই হ্রাস, পরিবেশ নিরাপদ রাখা এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য সফল হবে বলে মনে করছেন প্রধান প্রকল্প কর্মকর্তা।

মৃত্তিকা গবেষনা ইনষ্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ঠ জেলা সমূহের সমস্যাক্লিষ্ঠ মাটির লবনাক্ততা, পিট ও জলাবদ্ধ অবস্থা, বিস্তৃতি ও মাত্রা র্নিধারণ, নিরাপদ সেচের জন্য লবনাক্ত এলাকা সমূহের জন্য ৩৭টি উপজেলায় ভূপৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহারের র্নিদেশিকা প্রনয়ন, কৃষির উন্নয়নে মাটি ও ভুমি বিষয়ক ডিজিটাল তথ্য ভান্ডার তৈরী, মাটির ক্ষয়জনিত সমস্যা সমাধানে গবেষনা করা, মাটি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ২২সহস্রাধিক কৃষক ও সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং চাষাবাদে সুষম সার ব্যবহারের ইউনিয়ন র্নিদেশিকা প্রনয়ন করার লক্ষ্যমাত্রা র্নিধারণ করা হয়। উপকুলীয় এলাকার লবনাক্ততা ও খরা প্রবন জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্য নিয়ে গবেষনা শুরু করা হয়। গবেষনার মা্যধমে পানি ও মাটি পরীক্ষা এবং র্সাবিকভাবে চাষ পদ্ধতি ও সময়কাল নিয়েও গবেষনা র্কাযক্রম পরিচালিত হয়। প্রকল্পের আওতায় গবেষনা পরিচালনার ফলে অনেকগুরো ক্ষেত্রে বেশ সফলতা পাওয়া গেছে। পরে সেগুলো কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক ফসলী জমিকে দুই ও তিন ফসলী করতে এলাকার কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ এবং সার-বীজসহ অন্যান্য সহায়তাও প্রদান করা হয়। অনেকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রাথমিকভাবে বটিয়াঘাট, দাকোপ, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ ও পিরোজপুরে বেশকিছু কৃষককে পাইলটিং আকারে চাষাবাদের উদ্বুদ্ধ করা ঞয়। প্রথম বছরেই ভালো ফলন পাওয়ায় এলাকার কৃষকরা আগ্রহী হয়ে ওঠে। মৃত্তিকা উন্নয়ণ ইনষ্টিটিউটের উদ্যোগের ফলে উপকুলীয় খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট-গোপালগঞ্জ ও পিরোজপুর জেলার ৩৯টি উপজেলার প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমি ইতিমধ্যেই চাষের আওতায় এসেছে।এখন উপকুলীয় এলাকার পতিত জমিতে চাষাবাদের একটা সম্ভাবনা দেকা দিয়েছে।কৃষকদের মধ্যেও শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ প্রত্যামা সৃষ্টি করেছে। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পতিত থাকা ০৬’সহস্রাধিক হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে বলে মনে করছেন মৃত্তিকার এই গবেষকরা। ##

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here