দেখা হয়না হ্যাজাক লাইটের সাথে

429

রংপুর ব্যুরো :
আগের দিনগুলোতে প্রত্যন্ত গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে থাকতো এক আধটা হ্যাজাক লাইট। বাড়িতে ছোট বড় কোন অনুষ্ঠান হলে সকালবেলা শুরু হত তার ঝাড়পোঁছ। তারপর সন্ধ্যে বেলায় তাকে জ্বালানোর প্রস্তুতি। যে কেউ এই বস্তু জ্বালাতে পারতো না। সেরকম বিশেষ কোন ব্যক্তিকে সেদিন পরম সমাদরে ডেকে আনা হত। সেদিন তাঁর চাল চলন থাকতো বেশ দেমাকি। বাড়ির কচি কাচারা হ্যাজাক প্রজ্জ্বলনকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে বসত। এরপর তিনি হ্যাজাকে তেল আছে কিনা পরীক্ষা করে নিয়ে শুরু করতেন পাম্প। একবার একটা পিন দিয়ে বিশেষ পয়েন্টে খোঁচাখুঁচি করা হত। তারপর হ্যাজাকের একটা নব ঘুরিয়ে কিছু জ্বলন্ত কাগজ তার সংস্পর্শে আনতেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠত। তখন শুরু হত আচ্ছা করে পাম্প দেওয়া। ক্রমেই হ্যাজাকের মাঝখানের ম্যান্টল থেকে বেশ উজ্জ্বল আলো বেরনো শুরু হত। সেই সঙ্গে একটা বুকে কাঁপন ধরানো হিসসসসস আওয়াজ। মাঝে মাঝে আবার হ্যাজাকের ওপর দিয়ে দুম করে আগুন জ্বলে উঠত। আবার কখনও বা গোটাটাই নিভিয়ে যেত। সফলভাবে হ্যাজাক জ্বালানোর পর সেই ব্যক্তির মুখে ফুটে উঠত এক পরিতৃপ্তির হাসি। আর হ্যাজাকের সেই উজ্জ্বল জাদু আলোয় কচিকাচারা চলে যেত এক আনন্দের জগতে।

বিয়ে-শাদি, পূজা-পার্বণ, যাত্রাপালা, এমন কি ধর্ম সভায়ও ভাড়া দেওয়া হত এই হ্যাজাক লাইট। হ্যাজাক দেখতে অনেকটা হ্যারিকেনের মতোই কিন্তু আকারে বেশ বড়। আর প্রযুক্তিও বিভিন্ন রকম। পাম্প করে চালানো সাদা কেরোসিনের কুকারের মতো একই প্রযুক্তিতে জ্বলে এটা। চুলার বার্নারের বদলে এতে আছে ঝুলন্ত একটা সলতে। যেটা দেখতে প্রায় ১০০ ওয়াটের সাদা টাংস্টেন বাল্বের মতো। এটি অ্যাজবেস্টরে তৈরি। এটা পুরে ছাঁই হয়ে যায় না। পাম্প করা তেল একটা নলের ভিতর দিয়ে গিয়ে স্প্রে করে ভিজিয়ে দেয় সলতেটা। এটা জ্বলতে থাকে চেম্বারে যতক্ষণ তেল আর হাওয়ার চাপ থাকে ততক্ষণ। তেলের চেম্বারের চারিদিকে থাকে চারটি বোতাম। একটি পাম্পার। একটি অ্যাকশন রড়। একটি হাওয়ার চাবি। আর একটি অটো লাইটার বা ম্যাচ। অ্যাকশন রড়ের কাজ হচ্ছে তেল বের হওয়ার মুখটা পরিষ্কার রাখা। হাওয়ার চাবি দিয়ে পাম্পারে পাম্প করা বাতাসের চাপ কমানো বাড়ানো হয়। একবার হাওয়া দিলে জ্বলতে থাকে কয়েক ঘন্টা আর দেড় লিটার তেলে জ্বলে সারা রাত।

হ্যাজাক লাইট মেরামতকারী রমেশ চন্দ্র দাস এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, ২০ বছর আগে হ্যাজাকের ব্যবহার যতেষ্ট ছিল। তখন হ্যাজাক লাইট ঠিক করে ভাল আয় হত। দিনে ৪-৫টি করে মেরামত করে ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার করতাম। কিন্তু বর্তমানে হ্যাজাক লাইট নেই বললেই চলে। তাই এখন পেশা পরিবর্তন করে বাইসাইকেল (দি-চক্রযান) এর মেরামতের কাজ করি। হ্যাজাক লাইটের বানারের কাজ হচ্ছে তেল সাপলাই দেওয়া, পিন: তেল বন্ধ করা এবং খোলা, মাটিরছিদ্র, ভেপার: তেল সাপলাই দিয়ে ম্যাকজিনে ম্যান্টল বাধা হয়, ম্যাকজিন তেল সাপলাই দেয়, চেমি/কাইচের কাজ হচ্ছে আলো বৃদ্ধি করা এবং হাড়িতে তেল ধরে ডের কেজি। এই তেল দিয়ে প্রায় সারা রাত চলে যায়, ১২৫ টাকা করে ভাড়া দেওয়া হত প্রায় ৪০ বছর আগে।

বর্ষার শুরতে এবং শীতের শুরুতে জৈষ্ঠ থেকে ফালগুন মাস পর্য়ন্ত এই ১০ মাস মাছ শিকারের জন্য অনেকে হ্যাজাক ব্যবহার করেন বলে জানান, মজিবর রহমান(৬০) ও আয়নাল হক( ৪৫)। ২০১০ সালের পর বিদ্যুৎ চলে আসে গ্রামে। তার পর থেকে হ্যাজাকের কদর ফুরিয়েছে। এভাবে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার একসময়ের আলোর উৎস হ্যাজাক লাইট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here