শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২, ০৬:২৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
খুলনার বৃক্ষমেলায় প্রায় ৪৯ লাখ টাকার  চারা বিক্রি রূপসায় চিংড়ির পঁচা মাথার গন্ধে মারাত্নক পরিবেশ দুষন, জনজীবন অতিষ্ঠ অবৈধ সরকার অর্থনীতিসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে চলতি মাসও টিকে থাকতে পারবে না : বিএনপি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুরি হওয়া মালামালসহ ০৪ চোর আটক রূপসায় চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করার সময় হাতেনাতে আটক, ৭জনের কারাদন্ড জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিশেষ বর্ধিত সভা বিশ্বকে বাংলাদেশের সক্ষমতা দেখিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা : সিটি মেয়র শিক্ষকদের পাণ্ডিত্য, গবেষণা ও ব্যক্তিত্ব শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করে কুয়েট ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন মেয়াদকাল শেষ রামপাল কলেজ শিক্ষকের অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে হুমকি, থানায় জিডি

বিকশিত শিশুরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ

সংবাদদাতার নাম :
  • প্রকাশিত সময় সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৯
  • ৭২৩ পড়েছেন

দীপক রায়:

ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। কথাটি বাস্তব এবং চিরসত্য। আসা যাওয়ার এ পৃথিবীতে পুরাতনরা চলে যায় নতুনরা তাদের শুন্যতা পুরণ করে। তাইতো শিশুদের আগামী দিনের কর্ণধর বলা হয়। মায়ের নাড়ীছেঁড়া ধন তাঁর শিশু তাই একজন দম্পতির কাছে তাদের সন্তান অন্য সবথেকে বেশী আদরের। বাবা মা মনে করেন শুধু বংশ রক্ষা করার জন্য সন্তান নয় বৃদ্ধ বয়সে প্রত্যেক পিতা মাতাই সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। জ্ঞানীরা মনে করেন, সন্তানদের সঠিকভাবে মানুষ না করতে পারলে তারা বৃদ্ধ বাবা মাকে তো দেখেই না বরং নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়ে সমাজকে বিষময় করে তোলে। তাই সচেতন পিতা মাতা তাদের সন্তানদের মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

পরিবার হল একটি শিশুর সবকিছু শেখার প্রথম পাঠশালা। একটি শিশু জন্মগ্রহণ করার পর তার পরিবারে থেকে আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে। মায়ের মুখের কথা শুনেই সে কথা বলতে শেখে। মা বাবার হাত ধরেই সে প্রথম হাটতে শেখে। শিশুদের মন বড়ই কোমল কিন্তু ভিশন মনোযোগী তাই যা দেখে তা সহজে অনুকরণ করে। সে জন্যে বলা হয় শিশুরা যা দেখে তাই শেখে, যা শোনে তাই বলে। তাই শিশুদের সামনে খুব সতর্ক হয়ে চলাফেরা এবং কথা বলা উচিৎ। পরিবার থেকে শিশু অনেক কিছুই শেখে এবং সেটি তার চলার পথে এবং জীবনচারিতায় অনেকটা প্রভাব ফেলে। তাই একটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, খেলাধুলা, আদব কায়দা, নৈতিক শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা সবকিছুই পরিবার থেকেই হয়ে থাকে।

অনেক পিতা-মাতা শিশুর পছন্দ ও মতামতের কোনো মূল্য দেয় না। যেমন ধরা যাক, শিশু একটি জামা কিনবে সেখানে তার পছন্দের গুরুত্ব দিতে হবে, অর্থাৎ কোন রঙের, কোন ধরণের জামা তার পছন্দ এ বিষয়ে নিজের পছন্দ শিশুদের উপর না চাপালে ভাল হয়। তার মতের বাইরে কিছু করলে সে জামাটা পরে আনন্দ তো পাবেই না বরং সারাক্ষণ অ-স্বস্তিতে ভূগবে কখনও স্বাচ্ছন্দবোধ করবে না। এটা তার মনের ওপর এতটাই প্রভাব ফেলতে পারে যে সে খিটখিটে মেজাজের হয়ে যেতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকে একটি শিশুর পছন্দ, ইচ্ছা, চাওয়া, পাওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে তাতে তার মানসিক বিকাশে সহায়ক হবে। তবে এমন কোনো সখ বা ইচ্ছা পুরণ করা যাবেনা যাতে শিশুর উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশী হতে পারে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যেতে পারে একজন শিক্ষার্থীর বয়স আঠারো বছর হয়নি সবে নবম বা দশম শ্রেনীতে পড়ে সে মোবাইল ফোন কেনার বায়না ধরেছে, তাকে এটা ভূল করেও কিনে দেওয়া যাবে না। কেননা একজন শিশু মোবাইল ফোনে ফেসবুক কিংবা ইন্টারনেট এডিকটেড হলে তার পড়া লেখার যেমন ক্ষতি হবে তেমনি অতিরিক্ত মোবাইল কল রিসিভ এবং কল করার কারণে তার কান ও মস্তিস্কের ক্ষতি হতে পারে। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মোবাইল ফোনের ব্যবহার মানুষের কানের সমস্যাসহ ব্রেইন টিউমার এবং ব্রেইন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

শিশুর খাদ্যের উপর নির্ভর করে তার শারিরিক সুস্থ্যতা শরীরের বৃদ্ধি। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায় কোনো পরিবারেই শিশুর জন্য দৈনিকের খাদ্য তালিকায় তাদের জন্য কোনো পৃথক খাবার থাকে না। বড়রা যে খাবার খায় শিশুদেরও সে খাবার দেওয়া হয়। একটা বিষয় সব সময় মাথায় রাখতে হবে যে, বড়দের খাবার বড়রা ছাড়া শিশুরা সহজে হজম করতে পারে না। ফলে এমনটা হলে ছোটবেলা থেকে শিশুরা পেটের রোগে ভূগতে থাকে। ফলে  সেসব খাবারের কোনো পুষ্টিই শিশুর শরীরে কাজে আসে না বরং ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশে বাড়ীতে এবং আপ্যায়নে শিশুদের স্বাস্থ্যপযোগী পৃথক খাবারের ব্যবস্থা থাকে। খাবারের পাশাপাশি শিশুর খেলাধুলা ও বিনোদনের বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। খেলাধুলা শিশুকে শারিরিকভাবে এবং মানসিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। জ্ঞানিরা বলেন, যে শিশু সংঘবদ্ধভাবে অন্য শিশুদের সাথে খেলে তার নেতৃত্ব দেওয়ার শক্তি বাড়ে, সহনশীলতা বাড়ে, বাড়ে মানসিক শক্তি। নিজের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ওঠে। আর একটি বিশেষ বিষয় হল বিনোদন। সারাদিনের স্কুল, পড়া-লেখায় শিশুরা মাসসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তাই পড়া-লেখার সাথে সাথে শিশুকে গান-বাজনা, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন বিনোদনের সুযোগ করে দিতে হবে। প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহনের সুযোগ করে দিতে হবে। শিশুকে নিয়ে মাঝে মাঝে বিভিন্ন মেলা, পার্ক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ঘুরতে হবে। তাতে শিশু যেমন আনন্দ পাবে তেমনি পিতা-মাতার সাথে তাদের সম্পর্কের বন্ধনটাও সু-দৃঢ় হবে। এতে শিশুর মানসিক ক্লান্তি দূর হবে ফলে পড়া-লেখা ও অন্য কাজে আরও বেশী মনোযোগী হতে পারবে। যতটুকু সম্ভব পৃথিবীর ফুল লতা বৃক্ষ জীব-জন্তু পশু পাখিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে এই প্রকৃতিই হল পৃথিবীর বড় বই। প্রকৃতি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বই-পুস্তক লেখা হয়। সেদিন এক অভিভাবক মজা করেই তার তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ুয়া ছেলে মেয়েকে ডেকে প্রশ্ন করলেন, বল তো ধান গাছের তক্তা শক্ত বেশী না কলা গাছের তক্তা শক্ত বেশী? উত্তরে একজন বলল ধান গাছ অন্যজন বলল কলা গাছ। শুনে ভদ্রলোক অবাক হলেন। তারপর তিনি তার সন্তানদের নিয়ে কলা গাছ ধান গাছ এবং তক্তা চিনতে নিয়ে গেলেন। প্রিয় পাঠক বাস্তবতা এমনই।

পিতা মাতাকে প্রতিটি সময় শিশুর প্রতি নজর রাখতে হবে। সে বাড়ীর থেকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে আসলে স্কুলে যাচ্ছে কি-না, কোনো বখাটে ছেলেদের সাথে খেলছে কি-না,কোনো নেশাখোর নষ্ট মনের ছেলে মেয়েদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে কি-না এসব খেয়াল রাখতে হবে। কোনো শিশুর মন খারাপ দেখলে তার মন খারাপের কারণ জানার চেষ্টা করতে হবে এবং তা যত দ্রুত সম্ভব সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। শিশুকে কখনো কঠোরভাবে শাসন নয় বরং তার ভূলগুলো ধরিয়ে দিয়ে সহজভাবে সংশোধনের উপায় খুঁজতে হবে । শিশুরা যেন ভাবতে শেখে বাবা মার মত আপন পৃথিবীতে আর কেউ নেই। শিশুদের ধর্মীয় অনুশাসনগুলি ভালোভাবে রপ্ত করাতে পারলে সে সহজে উল্টোপথে হাঁটবে না। সে সবসময় বিবেকের অনুশাসন দ্বারা সঠিক পথে পরিচালিত হবে। আদর যত্নে লালন পালন হলে শিশু মানুষকে ভালোবাসতে শেখে মনের থেকে পাশবিক আচরণগুলি দূরীভুত হয়।

পরিবারের পরেই আসে শিশুর স্কুল। যেখানে শিশু দিনের অর্ধেকের বেশী সময়টা কাটিয়ে থাকে। শিশুর স্কুল হতে হবে সবথেকে নিরাপদ স্থান। চীন জাপানে শিশুর স্কুলেই খাওয়া, খেলাধুলা এবং ঘুমানোর ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ হাসি খুশী খেলাধুলার মধ্যে শিশুর শিক্ষা হওয়া উচিৎ। আমাদের দেশে অধিকাংশ স্কুলে খেলার মাঠই নেই। আমাদের দেশে শিশু শিক্ষার বৈষম্য আজও বিদ্যমান। গ্রামের শিশুরা শহরের শিশুদের মত শিক্ষার সমান সুযোগ পায় না। ধনী গরীবের বৈষম্য তো রয়েছেই। দরিদ্র শিশুরা অনেক টাকা দিয়ে ভাল শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে পারে না। প্রয়োজনমত বই কেনার সুযোগ পায় না। সবসময় মনে রাখতে হবে একটি আদর্শ স্কুল একটি শিশুর জীবনে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। একজন আদর্শ শিক্ষককে শিশু কিশোররা অনুসরণ করে থাকে। আমরা পুরাকালে আরুনির গুরুভক্তির কথা পড়েছি। বিদ্যাসাগরের মায়ের আদেশ পালনের কথা পড়েছি। বায়েজিদের মাতৃভক্তির কথা পড়েছি, এসবই আদর্শ পিতা মাতা এবং সৎ গুরুর শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর পুত্রের শিক্ষকের কাছে চিঠি দিয়ে ছিলেন তাকে কোন কোন বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা দিতে হবে সে বিষয় উল্লেখ করেন। তাঁর চিঠির প্রথমেই ছিল আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি। কাজী কাদের নেওয়াজের শিক্ষা গুরুর মর্যাদা কবিতায় বাদশাহ আলমগীর পুত্রের শিক্ষক মৌলভীকে ডেকে বলেছিলেন তাঁর পুত্র গুরুর চরণ ধোয়ার জন্য পানি ঢেলেছে, কেন নিজহাতে চরণ ধুয়ে দিইনি, কেন তার পূত্র এ নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলো এবং তাতে বাদশাহ্ মনে ব্যাথা পেয়েছেন। তাহলে বোঝা যায় একজন শিশুকে সঠিকভাবে মানুষ করতে হলে একজন শিক্ষকের ভূমিকা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শিশু সুন্দর আচার আচরণের মধ্যে বেড়ে ওঠার জন্য তার আশপাশের পরিবেশ অনেকটা কাজ করে অর্থাৎ সামাজিক পরিবেশ একটি বড় বিষয়। একজন মানুষ যদি মনে করেণ আমি ভালো খাব, ভাল পরব, আমার সন্তানদের খালোভাবে মানুষ করব তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে পারে। কারণ একটি শিশু জন্মের পর থেকে তার পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে মিলেমিশে বড় হয়। সেজন্য গ্রামের অন্য দশটি শিশু যদি বিপথে হাঁটে সেখানে ভাল ছেলেটিও তাদের সঙ্গ নেবে না সেকথা বলা কঠিন। সেকারণে এলাকার কোনো শিশুর চলাফেরা খারাপ দেখলে তার অভিভাবকদের সাথে কথা বলা তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।

এভাবে সচেতন নাগরিকরা শিশুদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করতে পারেন। ভূলে গেলে চলবে না শুধুমাত্র বিকশিত শিশুরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। শারিরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ্য, নেশাগ্রস্থ অথবা বিপথগামী শিশুরা কখনও নয়।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক।

সংবাদটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করা হলো

এ ধরনের আরো সংবাদ

© All rights reserved by www.banglardinkal.com (Established in 2017)

Hwowlljksf788wf-Iu