ভরা কটালে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস, উপকূলজুড়ে প্লাবন সম্ভাবনা

245

অফিস ডেস্ক :
পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি এরই মধ্যে রূপ নিয়েছে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে। উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ‘ইয়াস’ নামের এই ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব কমে আসায় সমুদ্র বন্দরগুলোতে বাড়ানো হয়েছে সতর্ক সংকেত। এদিকে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কারণে সারাদেশের সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৫ মে) বিকালে এই ঘোষণা করে বিআইডব্লিউটিএ।

এখন পর্যন্ত এর গতিপথের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গের দিঘা ও বালেশ্বর উপকূলের মাঝামাঝি হয়ে এটি যাবে ঝাড়খাণ্ডের দিকে। মূল ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত না করলেও এর প্রভাবে খুলনা উপকূলে প্রচুর ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছেই। আগামীকাল বুধবার (২৬ মে) দুপুর নাগাদ উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। আবহাওয়াবিদেরা ধারণা করছেন, তিন দশক পর বঙ্গোপসাগরে এমন শক্তিশালী কোনো ঘূর্ণিঝড় ইয়াস হানতে যাচ্ছে যার সঙ্গে (ভরা কটাল) পূর্ণিমার প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু জোয়ারের মুখে পড়েছে।

জ্যোতির্বিদা বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, আগামী বুধবার (২৬ মে) শুরু হচ্ছে শাওয়াল মাসের চাঁদের পূর্ণ তিথি তথা পূর্ণিমা। অর্থাৎ বুধবারেই উপকূলে থাকবে তেজ কটাল বা ভরা কটাল। আবার বর্তমান গতিপথ অনুযায়ী বুধবারই উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলে আছড়ে পড়ার কথা রয়েছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস-এর। অর্থাৎ তেজ কটালের পূর্ণ জোয়ারের সময়ই আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। এমনিতেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ইয়াস-এর। তেজ কটালের সঙ্গে এর উপকূলে আঘাত হানার সময়টিও মিলে গেলে ইয়াস ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে— এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আর এরকম ঘূর্ণিঝড় কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশের পূর্ব উপকূল একানব্বইয়ের সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলে হয়েছে, পূর্ণিমার প্রভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৪ ফুট বেশি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

ঝড়ের বর্তমান গতিপথ বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদেরা অবশ্য এখনই এতটা শঙ্কিত হতে নারাজ। ঘূর্ণিঝড়ের মূল গতিপথ যেহেতু ভারতের দিকে, তাই বাংলাদেশের উপকূলে এর তীব্রতা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাবে না বলেই মনে করছেন তারা। জানতে চাইলে ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, ভরা কটালের সময়ই সম্ভবত ঘূর্ণিঝড় ইয়াস স্থলভাগে আঘাত করবে। তবে আমাদের বিভিন্ন অ্যানালাইজার বা মডেল যেগুলো আছে, সেগুলোর তথ্য বলছে— এটি আমাদের ছেঁড়াদ্বীপ ও ভারতের সাগর দ্বীপের মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে যাবে। তো সে হিসাবে আমাদের উপকূল খানিকটা নিরাপদে থাকতে পারে। তবে অনেক সময় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ বদলেও যায়। তেজ কটালের সঙ্গে একই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের আগমনে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বজলুর রশিদ বলেন, ভরা কটালে নিজস্ব জোয়ারের একটা উচ্চতা তো আছেই। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়লে এই উচ্চতা নিশ্চয় আরও বাড়তে পারে। আবার বর্ষাকালে পানির উচ্চতা একটু বেশিই থাকে। এমন কয়েকটি বিষয় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে ঘূর্ণিঝড় আমাদের দিকে কতটা আসছে, সেটির ওপরই আসলে বাকি বিষয়গুলো নির্ভর করছে।

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ভারতীয় উপকূলেই মূল আঘাতটি হানবে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। তবে এসব ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতি পাল্টাতে সময় লাগে না। গতিপ্রকৃতি না পাল্টালেও ঘূর্ণিঝড়ের উপকেন্দ্রের বাইরের অংশটির প্রভাব খুলনা উপকূলে পড়বে ভালোভাবেই। আর সেই সময়েই তেজ কটাল বা ভরা কটাল ঘটলে জোয়ারের পানির উচ্চতা হতে পারে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত না হলেও জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটায় ঠিকই আক্রান্ত হতে পারে খুলনা ও সংলগ্ন উপকূল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে দুই নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত নামিয়ে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। তিন নং সতর্ক সংকেতে বলা হয়েছে, বন্দর ও বন্দরে নোঙর করা জাহাজগুলোর দুর্যোগকবলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্দরে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। ঘূর্ণি বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার হতে পারে।

আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এখন ঝড়ের যে গতিপথ, তাতে এটির আমাদের উপকূলে আঘাত হানার সম্ভাবনা নেই। তবে এর প্রভাব পড়বে। ঘণ্টায় আট থেকে দশ কিলোমিটার গতিতে আগাচ্ছে ইয়াস। তবে এটি আগামীকাল বুধবার সকালের পরিবর্তে দুপুর নাগাদ উত্তর-উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

ইয়াসের অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ আরো উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে একই এলাকায় (১৯.০ক্ক উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮.০ক্ক পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) অবস্থান করছে। এটি মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৪২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধীরে ধীরে এটি সুপার সাইক্লোনে পরিণত হচ্ছে।

আবহাওয়ার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলাসমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ৮০-১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। পূর্ণিমার প্রভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলাসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ২-৪ ফুট অধিক উচ্চতার জোয়ারে প্লাবিত হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here