পানি সংকটে হতাশ খুলনার তরমুজ চাষিরা

514

নিজস্ব প্রতিবেদক :
খুলনা জেলার দাকোপ, বটিয়াঘাটা, কয়রা, ডুমুরিয়া, রূপসা ও পাইকগাছা উপজেলায় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এ বছর তরমুজ চাষ হয়েছে। কিন্তু সেচের পানির অভাবে তরমুজ চাষিদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছে। দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। গত কয়েক মাস বৃষ্টি না হওয়ায় এবং স্থানীয় পানির উৎস নদী খালগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় তীব্র পনি সংকট। গাছের ফল শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গাছ মরে যাচ্ছে অনেক স্থানে। এ নিয়ে তরমুজ চাষিদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র থেকে জানা যায়, খুলনা জেলায় এবার তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রাত হয়েছে। খুলনা বিভাগের মধ্যে খুলনায় সবচেয়ে বেশি তরমুজের চাষ হয়। ২০১৪ সালে জেলায় সবচেয়ে বেশি তরমুজের আবাদ হয়। সে বছর জেলায় ৩ হাজার ৪৬৮ হেক্টর জমিতে তরমুজ হয়েছিল। তবে সে বছর ফসল তোলার সময় প্রচন্ড বৃষ্টি ও খারাপ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ে। ফলে ২০১৫-১৬ সালে তরমুজের আবাদ কম হয়। ২০১৭ সাল থেকে তরমুজের আবাদ আবার বাড়তে থাকে। গত বছর ২ হাজার হেক্টর জমিতে ১ লাখ ২০ হাজার টন তরমুজ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে তরমুজের ব্যাপক আবাদ হয়েছে।

জেলার মোট উৎপাদিত তরমুজের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় দাকোপ উপজেলায়। গত বছর দাকোপে ১ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছিল। এবার ৩ হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে বটিয়াঘাটায় ২ হাজার ১৫০ হেক্টর, কয়রায় ৬৫০ হেক্টর, ডুমুরিয়ায় ২৩০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।

দাকোপ, বটিয়াঘাটা ও কয়রা উপজেলার স্থানীয় তরমুজ চাষিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তরমুজ এখানকার কৃষকের ২য় প্রধান ফসল। প্রতি বিঘায় আমন ধান উৎপাদনে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, সময় লাগে ৫ মাস। এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়। সেখানে তরমুজের বীজ বপন থেকে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত সময় লাগে সর্বোচ্চ ৯০ দিন। বিঘা প্রতি খরচ হয় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। প্রতি বিঘা তরমুজ বিক্রি হয় সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৮৫ হাজার টাকা। লাভ বেশি হওয়ার কারনে তরমুজ চাষে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেতের তরমুজগাছ গাছে ফল ধরেছে। কিছু ক্ষেতের তরমুজ বড় হয়ে গেছে। পানি, সার ও কীটনাশক ছিটানোয় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। প্রচণ্ড তাপে এবং দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় মাঠের ভেতরের খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। ফলে দেখা দিয়েছে সেচের পানির তীব্র সংকট। অনেকে ছোট ছোট কুয়ো কেটে সেচ দিচ্ছেন কিন্তু সে পানির আধারগুলোও এখন শুকিয়ে গেছে।
দাকোপের বাজুয়া ইউনিয়নের তরমুজ চাষি কুশল গাইন ১০ বিঘা জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, এবার এলাকায় প্রচুর পরিমাণে তরমুজ আবাদ হয়েছে। এ জন্য পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেতে গাছ মরা শুরু করেছে। অধিকাংশ খাল এখন শুকনা। তরমুজ ক্ষেত থেকে দুরবর্তী কচা ও ভাইজুড়ি খালে পাম্প মেশিন বসিয়ে কোনোমতে পানি তোলা হচ্ছে। গাছ বাঁচাতে দুর থেকে পানি আনতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের তরমুজ চাষি শৈতাপ গায়েন জানান, আমাদের এলাকা সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানি লবনাক্ত। স্থানীয় নদী খালে জমা বৃষ্টির পানি আমাদের ভরসা। গত তিন চার মাস বৃষ্টি না হওয়ায় এলাকায় এখন পানির তীব্র সংকট। পাশের চড়া নদীর পানি প্রায় শেষ, তক্তামারী খাল শুকিয়ে গেছে। বৃষ্টি না হলে গাছ বাঁচানোর আর কোন পথ থাকবে না। প্রচন্ড খরার কারনে তরমুজ গাছে ভাইরাস দেখা দিয়েছে। গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে, ফল ঝরে যাচ্ছে। একই ইউনিয়নের তরমুজ চাষি বিপ্লব মন্ডল, ৫বিঘা জমিতে ভিন্নধর্মী তৃপ্তি জাতের হলুদ রং এর তরমুজ চাষ করেছেন। যার উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। তিনিও সেচের পানি সংকটে হতাশায় ভুগছেন।

দাকোপ ইউনিয়নের তরমুজ চাষি সরোজিত মণ্ডল বলেন, ‘‘১২ বিঘা জমিতে তরমুজের আবাদ করেছি। পাশের বাঠাকাটা, কাটাখালি, কাঁকড়াবুনিয়া, কালীতলা খালে পানি নেই। যদি বৃষ্টি না হয়, তবে গাছ বাঁচবে না। এলাকার প্রায় চার হাজার কৃষক পানি পাচ্ছে না।’’

বটিয়াঘাটা উপজেলার সুরখালী ইউনিয়নের তরমুজ চাষি শশাঙ্ক রায় ও সবুজ জানান, আমাদের এলাকার ছোট ছোট খালের পানি শুকিয়ে গেছে। বড় বড় খালগুলো মাছ চাষের জন্য ইজারা দেওয়ার কারণে ইজারাদাররা তরমুজ চাষিদের পানি সেচে বাধা দেওয়ায় চাষিরা বিপাকে পড়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও বৃষ্টির অভাবে এখন পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শিঘ্রই বৃষ্টি না হলে তরমুজ চাষিরা এবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান বলেন, তরমুজ চাষে পর্যাপ্ত সেচের প্রয়োজন হয়। প্রচণ্ড খরায় উচ্চ তাপ ও পানির সংকট গাছের ডগা শুকিয়ে যাওয়া, ফল ঝরে যাওয়া ও ফল বড় না হওয়ার প্রধান কারন। এছাড়া মাত্রা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারনে মৌমাছি না আসায় পরাগায়ন ব্যাহত হওয়ায় ফল কম ধরে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে তরমুজ ক্ষেতে দেওয়ার জন্য কোনো পানি থাকবে না। বিএডিসিকে ১০২টি খাল খননের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা কিছু খননকাজ শুরু করেছে। স্থানীয় সমস্যার কারণে কিছু খাল খনন করা যাচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে সব খাল খনন করা গেলে পানির সমস্যা কমবে।

বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, গত কয়েক মাস ধরে বৃষ্টি না হওয়া এবং প্রচন্ড খরার কারনে স্থানীয় পানির উৎস খাল-বিল শুকিয়ে চৌচির, নদী-নালাগুলোও শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের পানির অভাবে চাষিরা। স্থানীয় বড় বড় খালগুলো মাছ চাষের জন্য ইজারা দেওয়ায় ইজারাদাররা তরমুজ চাষিদের সেচে বাধা সৃষ্টি করায় চাষিরা বিপাকে পড়েছে। খালগুলোর ইজারামুক্তি এবং ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ খাল খননের জন্য মন্ত্রনালয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খালগুলো খনন করা গেলে সমস্যার সমাধান হবে আশা করছি।

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, স্বল্প সময়ে লাভজনক ফসল হওয়ায় এ বছর খুলনা জেলায় তরমুজের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। গতবার কৃষকেরা তরমুজ চাষ করে লাভ করেছিলেন। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় দীর্ঘদিন বৃষ্টি হয়নি। ফলে স্থানীয় পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের পানির অভাবে উৎপাদন ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি হলেই পানির সমস্যা মিটবে। এছাড়া বিপণন ব্যবস্থা আরও ভালো না হলে চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here