বেড়ায় গো খাদ্য সংকট নিরসনে ভরসা এখন কচুরি পানা

199

নির্মল সরকার, বেড়া পাবনা :
দীর্ঘ মেয়াদি বর্ষা, জলবদ্ধতা, মাঠে পানি, মাঠে কাঁচাঘাস চাষ না হওয়ায় ও খড়ের উচ্চ মূল্যের কারনে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত গবাদিপশু পালকেরা খালে বিলে,বদ্ধ জলাশয়ে বেড়ে উঠা কচুরি পানা তাদের গবাদি পশুকে গো-খাদ্য হিসেবে খাওয়ানো হচ্ছে।

বেড়া উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষক গবাদিপশু লালন-পালন করে থাকেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ গবাদি পশুপালক নিন্মবিত্ত ও দরিদ্র। এছাড়াও রিক্সাচালক, দিনমজুর এদের মত স্বল্প আয়ের মানুষ কোরবানীর ঈদ সামনে রেখে দু’একটা ষাড় বাছুর লালন পালন করে থাকে। প্রতিদিনের আয় থেকে সংসার খরচের পাশাপাশি গরু লালন পালন করে এবং বছর শেষে গরু বিক্রি করে সংসারের বড় প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে।

বর্ষার সময় গো-খাদ্য সংকট প্রতি বছর কম বেশী হয়ে থাকে। তবে এবারের দীর্ঘ মেয়াদি বর্ষার কারনে মাঠে কাঁচা ঘাসের চাষ না হওয়ায় গো খাদ্য তীব্র আকার দেখা দিয়েছে। কাঁচা ঘাসের যোগান না থাকায় খড়ের মুল্য সহ গো-খাদ্যের দাম তিন চার গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ২শ’টাকা মন খড় ৮শ’টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে গো-খাদ্য যোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গো-খাদ্য সংকট ও উচ্চ মূল্যের কারনে শুধু স্বল্প আয়ের গো পালকই নয় বৃত্তশালী গো-খামারীরাও তাদের খামার থেকে গরু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বেড়া বৃশালিখা গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন,আমার গরুর পালে ছোট বড় ৮টি গরু ছিল। জমি থেকে যে খড় পাই তাতে বছরের প্রায় ৭ মাস চলে যায়,বর্ষার শেষ দিকে প্রায় মাস খানেক সময় সামান্য কিছু খড় কিনে চালাতে হয়। অবশিষ্ট ৪ মাস জমির কাঁচা ঘাস, জমিতে বোনা খেসারী,মাষকালাই খাওয়ানো হয়ে থাকে। এবার দীর্ঘ মেয়াদি বর্ষার জন্য জমিতে প্রাকৃতিক ভাবে কোন ঘাস জন্মাতে পারেনি এবং খেসারী-মাষকালাই চাষও অনেক দেরীতে হবে। খড়ের দাম বেশী,মাঠে কাঁচা ঘাস না থাকায় এখন গরুর খাবার সংগ্রহ করতে বিপাকে পড়েছি। বাধ্য হয়ে প্রতিদিন গ্রামের পাশে পাম্পপিং ষ্টেশনের জলাশয়ে হওয়া কচুরি পানা তুলে নিয়ে এসে গরু গুলোকে খাওয়াচ্ছি। কচুরি পানা গরুকে খাওয়ালে গরুর দুধ কমে যায় এবং দূর্বল হয়ে পড়ে। হাটে গরুর দামও অনেকটা কমে গেছে,খাদ্য সংকটের কারনে বাধ্য হয়ে বাছুর সহ দুধেল গাভী বিক্রি করে দিয়েছি।

হুড়াসাগর নদীর পাড়ের চর আন্ধার মানিক গ্রামের দিন মজুর রঞ্জু মিয়া বলেন,সাত মাস আগে ৪২ হাজার টাকা দিয়ে একটি ষাঁড় বাছুর কিনেছিলাম,খড় ভুষি সহ গো-খাদ্যের অস্বাভাবিকদাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়ার সিএন্ডবি গরুর হাটে ৩৯ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেই। ৮শ’থেকে ৯শ’টাকা মন খড় কিনে খাওয়ানো আমাদের মত দিন মজুরের পক্ষে সম্ভব নয়,আবার কচুরি পানা কয়েক দিন খাওয়ানোয় বাছুরটি দুর্বল হয়ে পড়তে থাকায় তাই লোকশান হলেও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হলাম। গো খাদ্য সংকটের কারনে প্রায় অধিকাংশ গবাদিপশু পালক কচুরি পানা সংগ্রহ করে গরুকে খাওয়াচ্ছে। বেড়া পাম্পিং ষ্টেশনের জলাধারে কচুরি পানা সংগ্রহ করতে আসা হাতিগাড়া গ্রামের লোকমান, রিয়াজ, রহিমবক্স, জুলহাস, মনিরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রায় ১ মাস হলো কচুরি পানা সাথে সামান্য পরিমান খড় দিয়ে গরু-বাছুর গুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। গো-খাদ্য হিসেবে কচুরি পানার কোন গ্রহন যোগ্যতা নেই। শুধু আপদ কালীন সময়ে কচুরি পানা দিয়ে গরু গুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। বর্ষা মৌসুমের শেষের দিকে ক্ষনস্থায়ী গো-খাদ্য সংকট হলেও জ্ঞান হওয়ার পর এমন গো-খাদ্য সংকট কখনও দেখেননি বলে জানান উপজেলার বাঁধের হাট এলাকার বর্ষীয়ান কৃষক আনোয়ার হোসেন।

বেড়া পৌর সভার বনগ্রাম এলাকার দিন মজুর সিদ্দিক আলী তার ছোট বড় ৩টি গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। নিজের কোন জমি না থাকায় অন্যের জমির আইল ছেটে,নিড়ানি দিয়ে ও সামান্য খড় কিনে গরুর খাবারের যোগান দিতেন। কিন্তু এ বছরে জমিতে পানি থাকায় কাঁচঘাস যোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে সেই সাথে ৯শ”টাকা মন খড় কিনে খাওয়ানোর সামর্থ্য তার নেই । আক্ষেপের সুরে সিদ্দিক বলে হাটে গরুর দাম ও চাহিদা কম থাকায় অনেক লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করতে হয় আবার উচ্চ মুল্যের গো-খাদ্য কিনে খাওয়ানো সম্ভব নয়,তাই নিরুপায় হয়ে পাবনা প্রকল্পের জলাধারের কচুরি পানাই একমাত্র ভরসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here