কয়রায় বিটি বেগুন চাষ করে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা

121

অরবিন্দ কুমার মণ্ডল, কয়রা(খুলনা) : 
কয়রায় বিটি বেগুন চাষে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা। এই জাতের বেগুনের উৎপাদনে যেমন খরচ অনেক কম তেমনি বাজারে এর দামও ভালো। বাংলাদেশ কৃষি গভেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি-বিটি জাতের এই বেগুন সরেজমিন কৃষি গবেষণা বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী চাষ করে অনেকেই এরই মধ্যে লাভবান হয়েছেন। এ জন্য বিটি বেগুন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে স্থানীয় কৃষকেরা।

কৃষি গবেষণা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বেগুন চাষের সময় ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমনে ৭০-৮০ ভাগ বেগুন মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য প্রতি বছর ১৭-২০ লাখ মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। ফলে বেগুন চাষের খরচ বেড়ে যায় এবং কৃষকেরা এ থেকে লাভবান হতে পারেন না। তাছাড়া প্রচুর পরিমানে কীটনাশকের ব্যবহার মানবদেহের জন্যও ক্ষতিকর। পোকার আক্রমণ সহনীয় হিসেবেই বিটি-১,২,৩, ও ৪ নামে চারটি নতুন উদ্ভাবন করে কৃষি গভেষণা ইনস্টিটিউট। এসব জাতের বেগুনের ডগা ও পোকা আক্রমণ করতে পারে না। ফলে বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদন সম্ভব হয়।

কয়রা উপজেলার চাষী গোপাল সরদার বলেন, বিটি বেগুন চাষ পরিবেশবান্ধব। এতে কোনো ধরনের বালাইনাশক স্প্রে করার প্রয়োজন পড়ে না। সরেজমিন গভেষণা বিভাগের কর্মকর্তার অনুরোধে বিটি বেগুনের চাষ শুরু করি। আগষ্ট মাসে বীজতলায় বীজ বপন করে সেপ্টেম্বরে চাষ শুরু করি ও নভেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহ থেকে বেগুন তোলা শুরু করি। এখন প্রতি সপ্তাহে ২ বার বেগুন তুলতে পারছি, প্রতিবার ১৫০ থেকে ১৮০ কেজি বেগুন তোলার পর তা বাজারে বিক্রি করে সংসারের খরচ চালিয়ে যাছি। তিনি আরও বলেন, প্রথম দিকে বাজারে বেগুন ৬২ টাকা দর বিক্রি হলেও বর্তমানে বিটি বেগুন বাজারে ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে তাই আগামী বছর আরো বেশি জমিতে এই বেগুনের চাষ করতে চাই। আমার বেগুনের খেত দেখে এলাকার অনেকেই বিটি বেগুন চাষ করবেন বলে আমার কাছে বেগুনর বীজ চয়েছেন। কৃষক গোপাল সরদার আরও বলেন, বেগুন চাষ করে এত লাভবান হব ভাবতে পারেনি। এবার ২০ শতক জমিতে বেগুন চাষ করেছি। চাষ করতে আমার ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার খরচ হয়েছে। আর সার বীজ সরেজমিন কৃষি গভেষণা বিভাগ থেকে সহযাগিতা পেয়েছি এবং প্রতিনিয়ত পরামর্শ পাচ্ছি ক্ষেতে বসে। আগামীতে ২ থেকে ৩ বিঘা জমিতে বিটি বেগুন চাষ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। সবচেয়ে বড়কথা, এই বেগুন বিষমুক্ত। এ পর্যন্ত ২ মাসে ৫০ হাজার টাকার বিটি বেগুন বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। আরও ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করতে পারবো।

কৃষক আজিজুল হক ১৩ শতক জমিতে বিটি বেগুন চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বেগুন চাষে মাত্র ১৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। কৃষক আহসান বলেন, আগে বেগুন চাষ করলে কীটনাশক কিনতে গিয়েই অনেক টাকা খরচ হয়ে যেত। তবে আমার পাশের জমিতে কীটনাশক ছাড়াই বিটি বেগুন চাষ করতে দেখেছি । আমিও আগামীতে এই বেগুন চাষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরেজমিন বেগুন ক্ষেত এমএলটি সাইট কয়রার বৈজ্ঞানিক সহকারী জাহিদ হাসান বলেন, প্রথম অবস্থায় কৃষকদের বেগুন চাষে আগ্রহী করতে বেগ পেতে হয়েছে। এর উৎপাদন সাফল্য দেখে উপজেলার অনেক কৃষক উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। স্থানীয় কৃষকদের বিটি বেগুনের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গত বছর ৩ জন কৃষককে প্রদর্শণী দেওয়া হয়েছিল। এ বছর ৬ জন কৃষককে বিটি বেগুন বারি-৪ প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডঃ হারুনর রশিদ বলেন, গোপালগঞ্জ জেলার (বিএআরআই) কৃষি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প এর আওতায় আমরা খুলনা জেলার সর্ব দক্ষিণের উপজেলা কয়রাতে বারি বিটি বেগুনর প্রদর্শণী দিয়েছি। দক্ষিণ অঞ্চলে আমাদের যে জাতগুলো ছিল সে জাতগুলােতে প্রচুর পরিমান পোকা লাগতো এবং কৃষক অনেক কীটনাশক স্প্রে করতো। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশ কৃষি গভেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) গভেষণা করে ব্যাসিলাস ট্যুরিনজিনসিস জাতের বেগুন বীজ উদ্ভাবন করেছে। ফলে কোন প্রকার কীটনাশক ছাড়াই বেগুন উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গভেষণা ইনস্টিটিউট থেকে আমরা বারি বিটি বেগুন ১, ২, ৩ ও ৪ উদ্ভাবন করেছি এর ভিতরে বারি বিটি বেগুন ৪ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ অনেক পছন্দ করছে। এই বেগুন টি সবুজ এবং ডিম্বাকৃতি এই বেগুনে বিশেষ গুন হলো পোকা লাগেনা এবং কৃষককে কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে না এবং মানুষ নিরাপদে একটি সব্জী খেতে পারছেন । নিরাপদ সব্জী খাওয়ার পেছনে মানুষের রোগ বালাই কম হচ্ছে, সাস্থ্য ঝুকি কমছে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। ফল ও পোকা প্রতিরোধী জাত হওয়ায় এই বেগুনের চাষ দিন দিন বাড়ছে। সব মিলিয়ে আরো বেশি বেশি কৃষক যদি বেশি বেশি চাষাবাদ করে তাহলে কৃষকরা লাভবান হবে। আগামী ২ বছর কৃষকদের মাঝে বিটি বেগুন প্রদর্শণী করার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবো বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here