দ্বাদশ ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনাল রচনা করলো এক অনন্য মহাকাব্য

0
1069

অনলাইন ডেস্ক:

১৪ জুলাই, ২০১৯ ঐতিহ্যবাহী লর্ডসে দ্বাদশ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি ক্রিকেট বিশ্বকাপ। ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো ফাইনাল খেলা স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠা নিউজিল্যান্ড। দুই দলের জন্যই ছিল প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ।

ঐতিহ্যবাহী লর্ডসে টসে জিতে প্রথম ব্যাটিং করে নিউজিল্যান্ড। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে তোলে ২৪১ রান। ২৪২ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামে ইংল্যান্ড। শেষ ওভারে ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫ রান। ক্রিজে নবম উইকেট জুটিতে বেন স্টোকস এবং আদিল রশিদ।

বোল্টের করা সেই ওভারে প্রথম দুই বলে রান পাননি বেন স্টোকস। তৃতীয় বলে ছক্কা হাঁকান স্টোকস। খেলায় তখনো এগিয়ে নিউজিল্যান্ড। কারণ জেতার জন্য ইংল্যান্ডের চাই ৩ বলে ৯ রান। চতুর্থ বলে ডাবল রান নেওয়ার পথে গাপটিলের থ্রো স্টোকসের ব্যাটে লাগলে অতিরিক্ত আরও চার রান আসে। পঞ্চম বলে রানআউট হন আদিল রশিদ। শেষ বলে দরকার হয় ২ রানের। ডাবল রান নেওয়ার পথে রানআউট হন মার্ক উড।

ম্যাচ টাই হলে গড়ায় সুপার ওভারে। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সুপার ওভারে বোলিং করেন ট্রেন্ট বোল্ট। সেখানে ব্যাটিংয়ে নেমে স্টোকস এবং বাটলার তুলে নেন কোনো উইকেট না হারিয়ে ১৫ রান। সুপার ওভারে ইংল্যান্ডের পক্ষে বোলিংয়ে আসেন জোফরা আর্চার। প্রথম বলেই ওয়াইড করে বসেন এই তরুণ পেসার। কিউই অলরাউন্ডার জিমি নিশাম প্রথম ৪ বলেই তুলে নেন ১২ রান। জয়ের জন্য কিউইদের প্রয়োজন ২ বলে ৩ রান। পঞ্চম বলে নিশাম সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক দেন গাপটিলকে। শেষ বলে মিড উইকেট অঞ্চলে খেলে দ্রুততার সঙ্গে প্রথম রান নিতে পারলেও দ্বিতীয় রান নেওয়ার সময়ে রানআউট হয়ে যান গাপটিল। ফলাফল আবারও টাই ম্যাচে। কিন্তু ম্যাচে বেশি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে শিরোপা জিতে নেয় ইংল্যান্ড।

এ যেনো এক মহাকাব্যিক ফাইনাল, যার অপেক্ষায় ছিল পুরো ক্রিকেট বিশ্ব। ১৯৭৫ এবং ১৯৭৯ সালের প্রুডেনশিয়াল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে এই লর্ডসেই যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া (১৭ রানে জয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ) এবং ইংল্যান্ডকে (৯২ রান) প্রায় একতরফা খেলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১৯৮৩ এর প্রুডেনশিয়াল ক্রিকেট বিশ্বকাপে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪৩ রানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপার স্বাদ নেয় ভারত।

১৯৮৭ সালের রিলায়েন্স ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৭ রানে হারিয়ে শিরোপা জেতে অস্ট্রেলিয়া। ১৯৯২ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২২ রানে হারিয়ে শিরোপা জিতে পাকিস্তান।

১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপে দুর্বল ভাবা শ্রীলঙ্কাও ফাইনালে প্রায় একতরফা খেলে অস্ট্রেলিয়াকে হারায় ৭ উইকেটে। ১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে একতরফা ম্যাচে পাকিস্তানকে ১৭৯ বল হাতে রেখে ৮ উইকেটে পরাজিত করে অস্ট্রেলিয়া। ২০০৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালেও ছিল অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য। ভারতকে তারা হারায় ১২৫ রানে। ২০০৭ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালেও অস্ট্রেলিয়া ডিএল মেথডে খুব সহজেই ৫৩ রানে পরাজিত করে শ্রীলঙ্কাকে। ২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনালে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস থাকলেও ১০ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটে শ্রীলঙ্কাকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ১০১ বল হাতে রেখেই ৭ উইকেটে পরাজিত করে শিরোপা জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া।

দ্বাদশ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগের প্রতিটি বিশ্বকাপের ফাইনালেই ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই আভাস পাওয়া যাচ্ছিল কে হতে পারে চ্যাম্পিয়ন। অনেকটা বলা যেতে পারে বিশ্বকাপের ম্যাচে শ্বাসরুদ্ধর ম্যাচ হলেও ফাইনাল ম্যাচ মানেই যেনো ছিল একপেশে লড়াই।

কিন্তু দ্বাদশ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল রচনা করলো এক মহাকাব্যের। যে মহাকাব্যিক ফাইনালে দুই প্রতিপক্ষ কেউ কাউকে রান ব্যবধানে হারাতে পারেনি।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দুই ফাইনালিস্টের লড়াই টাই হয়। ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে। সেখানেও কেউ কাউকে রানে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। এরকম পরিস্থিতিতে নিয়ম অনুযায়ী যে দল বেশি বাউন্ডারি হাঁকিয়েছে তাদেরই বিজয়ী ঘোষণা করার নিয়ম। ম্যাচের ভাগ্য লেখা হয় বাউন্ডারির হিসেব কষে। সুপার ওভার সহ ২৬টি বাউন্ডারি পেয়েছিল ইংলিশরা আর ১৭টি বাউন্ডারি পেয়েছিল কিউইরা। এই বাউন্ডারির ব্যবধান শিরোপা তুলে দেয় ইংলিশদের হাতে।

দুর্ভাগ্য নিউজিল্যান্ডের। শিরোপার খুব কাছে এসেও তা স্পর্শ না করার আক্ষেপ তাদের থাকবেই আর ম্যাচ শেষে তাদের বিমর্ষ চেহারা সেই হতাশাই প্রকাশ করছিল।

কিন্তু তাতে কি? বিশ্ব জুড়ে ক্রিকেট ভক্তরা এই ম্যাচেই দেখলো এমন এক ফাইনাল যেখানে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই কোনো রান বা উইকেটের ব্যবধানে নয়, বরং নির্ধারিত হলো বাউন্ডারির সংখ্যা দিয়ে। এমন মহাকাব্যিক ফাইনালের কথা ভুলবে না ক্রিকেট প্রেমীরা। জয় হয়েছে ক্রিকেটের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here