শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২, ০৬:১৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
খুলনার বৃক্ষমেলায় প্রায় ৪৯ লাখ টাকার  চারা বিক্রি রূপসায় চিংড়ির পঁচা মাথার গন্ধে মারাত্নক পরিবেশ দুষন, জনজীবন অতিষ্ঠ অবৈধ সরকার অর্থনীতিসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে চলতি মাসও টিকে থাকতে পারবে না : বিএনপি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুরি হওয়া মালামালসহ ০৪ চোর আটক রূপসায় চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করার সময় হাতেনাতে আটক, ৭জনের কারাদন্ড জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিশেষ বর্ধিত সভা বিশ্বকে বাংলাদেশের সক্ষমতা দেখিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা : সিটি মেয়র শিক্ষকদের পাণ্ডিত্য, গবেষণা ও ব্যক্তিত্ব শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করে কুয়েট ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন মেয়াদকাল শেষ রামপাল কলেজ শিক্ষকের অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে হুমকি, থানায় জিডি

আইলা দিবস; দাকোপের সেদিন এবং এদিন

সংবাদদাতার নাম :
  • প্রকাশিত সময় শুক্রবার, ২৪ মে, ২০১৯
  • ৮৬৯ পড়েছেন

দীপক রায়, দাকোপ (খুলনা) :
২০০৭ সালে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানার ঠিক দু’বছর পর ২০০৯ সালে ২৫ মে প্রলয়ংকারি ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে। আইলার প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে ব্যপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ২১ মে ২০০৯ তারিখে বঙ্গোপসাগরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আইলার সৃষ্টি হয় এবং উপকুলে আঘাত হানে ২৫ মে তারিখে। এর ব্যাস ছিল সিডরের চেয়ে বেশী, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার এবং সিডরের মত প্রায় ১০ ঘন্টা ধরে উপকুল অতিক্রম করে। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ৮০-১০০ কিলোমিটার।

মালদ্বিপের আবহাওয়াবিদরা ঝড়টির নামকরণ করেণ আইলা। আইলা শব্দের অর্থ হল ডলফিন বা শুশক জাতিয় জলজ প্রাণী। নামটি নির্ধারণ করেন জাতিসংঘের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহাওয়া বিদদের সংগঠন‘ইউএন স্কেপের’-এর বিজ্ঞানীরা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে আইলা আঘাত হানার ১০ বছর পরেও পূনঃর্বাসন না হওয়ার কারনে এখনও প্রায় দুই সহস্রাধিক পরিবার ওয়াপদার রাস্তার উপর মানবেতর জীবনযাপন করছে। বেড়িবাঁধের একাধিক স্থান এখনও ঝুঁকিপূর্ণ, সাইক্লোন সেল্টার রয়েছে জনসংখ্যা অনুপাতে অনেক কম এরমধ্যে আবার কিছু রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। আর্থীকভাবে এ এলাকার মানুষ রয়েছে দারিদ্র সীমার নিচে।

সেদিনঃ আবহাওয়া বার্তায় জানা গেল ২৫ মে আইলা সন্ধ্যা নাগাত আঘাত হানতে পারে তাই দাকোপ উপজেলা প্রশাসন, এনজিও, সিপিপি এবং ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ঐদিন সকাল থেকে মাইকিং করে পতাকা উত্তোলন করে জনগণকে সতর্ক করা হচ্ছিল। সাইক্লোন সেল্টারে যাওয়ার জন্য বার বার তাগিদ দেওয়া হচ্ছিল। ঝড়ের ক্ষয় ক্ষতি কমানোর জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছিল নেওয়া হয়েছিল প্রয়োজনীয় শুকনা খাবার, পানি, পানি শোধনের ঔষধ মজুদসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ । সতর্কবার্তা শুনে স্থানীয় চনগণও দূর্যোগ মোকাবেলার জন্য নিজেড়ের সাধ্যমত প্রস্তুতি নিয়েছিল। সে জন্য আইলার কারণে জীবনহানির ঘটনা দাকোপে তেমনটা ঘটেনি।

দাকোপ উপজেলা ৩টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে রয়েছে ৯টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা। ৩১ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে চালনা পৌরসভা, পানখালী ও তিলডাঙা ইউনিয়ন। ৩২ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে কামারখোলা এবং সুতারখালী ইউনিয়ন এবং ৩৩ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ,দাকোপ,বাজুয়া এবং বানীশান্তা ইউনিয়ন।

সকল প্রস্তুতির মাঝে সরাদিন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির পর রাতে প্রবল বেগে আইলা আঘাত হানলে তিলডাংগা, কামারখোলা এবং সুতারখালী ইউনিয়ন তিনটি মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩২ নম্বরের জালিয়াখালী, গোলবুনিয়া, নলিয়ান, গুনারি, কালাবগি এবং সুতারখালী নামক স্থানগুলিতে ওয়াপদার ভেড়ীবাঁধ ভেঙে গোটা ৩২ নম্বর পোল্ডার প্লাবিত হয়। তখন কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ ঘর বাড়ী হারিয়ে ওয়াপদার রাস্তার উপর খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নেয়। গবাদি পশু পানির স্রোতে ভেসে যায়। অনেকের বসত ভিটা মাটি ঢাকি, ভদ্রা ও শিবসা নদীতে বিলিন হয়। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভেঙে যায় শিক্ষার্থীদের পড়া লেখা বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তা-ঘাট ভেঙে গিয়ে এলাকার ভৌগোলিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে যায় মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। প্রবল বেগে লবন পানি প্রবেশ করায় এলাকায় সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দেয়। ফসলি জমির মাঝে কোথাও কোথাও বড় বড় বালির স্তুপ আবার কোথাও বালি জমে ভরাট হয়ে যায় ছোট ছোট নদী।

চিরচেনা দাকোপ আইলায় লন্ডভন্ড করে দিয়ে এক অচেনা রূপ দেয়। ঝড় আঘাত হানার পর দ্রুত চলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম। সরকারি ও বেসরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়। খাদ্য, পানি, ঔষধ, তাবু সরবরাহ করা হয় সেগুলি ছিল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম আর তাই পাল্টে যায় মানুষের জীবন যাত্রা। খাদ্যের অভাব , কর্মসংস্থানের অভাব, মানুষ বাঁচার জন্য এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে কেউ গেল সুন্দরবনে মাছ ধরতে সেখানে গিয়ে বাঘের আক্রমনে অনেকের জীবন যায়। কেউ গেল শহরে কাজ করতে, ভ্যান রিক্সা চালাতে, অন্যের বাড়ীতে কামলা খাটতে। টানা পাঁচ বছর লবনের কারনে এলাকায় কোনো ফসল হল না। মানুষের কষ্ট আর কমতে চায় না। ধনী গরিব সব একাকার হয়ে গেল। বাড়তি সতর্কতার জন্য প্রাণহানি না ঘটলেও অর্থনৈতিকভাবে বিশাল ক্ষতি করে দিয়ে গেল আইলা। এলাকায় দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে হল দ্বিগুন।

এদিনঃ আইলা আঘাত হানার পর দশ বছর হয়ে গেল অথচ এ এলাকার মানুষ এখনও আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ভিটে বাড়ি না থাকায় অনেকে এখনও বাড়ী ফিরতে পারেনি রয়ে গেছে সেই রাস্তার উপরে। এলাকার রাস্তা ঘাট এখনও মেরামত হয়নি। রাস্তাঘাট, বেড়িবাঁধ, নতুন সাইক্লোন সেল্টার নির্মান না হওয়ায় এখনও ঝড় আসলে মানুষ ভয়ে ভয়ে থাকে অদৃষ্টের উপর ভর করে। আর্থিক অনটনে চিরতরে এলাকা ছেড়েছে প্রায় দু’শ পরিবার।

কামারখোলা ইউনিয়নের ছোট জালিয়াখালি এলাকায় ওয়াপদার রাস্তার উপরে বসবাসরত অনিল রায়, ইমরুল সানা ও বেলাল গাজী জানান, আমাদের ভিটামাটি আইলায় ঢাকি নদীতে বিলিন হওয়ার পরে এনজিওদের টাকায় ওয়াপদার রাস্তার পাশে ভিটে বানিয়ে বাস করতেছিলাম। সে ভিটেও নদীতে ডুবে গেছে। নিজস্ব জায়গা জমি নেই যেখানে ঘর বাঁধবো তাই দশ বছর ধরে পরিবার নিয়ে রাস্তার উপরে বাস করছি।

সুতারখালির ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির জানান, নলিয়ান এলাকার প্রায় ১৪ কিলোমিটার ওয়াপদার ভেড়ি বাঁধ ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। চিনা কোম্পানী ওয়াপদার ভেড়ি বাঁধ নির্মানের কাজ নিয়েছে তারা তাদের মত কাজ করছে যেখানে আগে মেরামত করার দরকার সেখানে আগে না করে তাদের ইচ্ছামত করছে। দুই বছরের কাজ তিন বছর ধরেও শেষ করতে পারল না আরও তিন বছর লাগতে পারে। অনেকগুলি সুইস গেট নির্মান করার কথা কিন্তু তারা তা করছে না। সেগুলি নির্মান না হলে দ্রুত পানি নিস্কাসন করা যাবে না। এলাকায় ঠিকমত ফসল হবে না। তিনি জানান তার এলাকার প্রায় ২ হাজার পরিবার এখনও ওয়াপদার রাস্তার উপর বাস করছে।

কামারখোলা ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান পঞ্চানন মন্ডল বলেন, তার ইউনিয়নের জালিয়াখালি, চান্নিরচক এলাকায় প্রায় পাঁচ’শ ফুট ভেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ, কামারখোলা ডিএস-১ সুইস গেট, কামারখোলা নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় সাইক্লোন সেল্টার, জালিয়াখালি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সাইক্লোন সেল্টার নদীভাঙনের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব স্থানের যেকোনো একটি যখন তখন ভেঙে এলাকা প্লাবিত হতে পারে। তিনি আরও জানান চিনা কোম্পানী ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকায় ওয়াপদার ভেড়ীবাঁধ নির্মানের যে কাজ হাতে নিয়েছে তা চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। ২ বছরের কাজ ৩ বছরেও শেষ করতে পারল না, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৩ বছরেও শেষ করতে পারবে কিনা সন্দেহ! ততদিন পর্যন্ত আমার এলাকার মানুষ দূর্যোগ এলে চরম শংকায় দিন কাটাবে। তিনি জানান, নিজস্ব ভিটে মাটি না থাকার কারণে ছোট জালিয়াখালী ওয়াপদার রাস্তার উপরে এখনও ২৫টি পরিবার বাস করছে।

দাকোপ উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মুনসুর আলী খান বলেন, আইলা এলাকার মানুষ দীর্ঘ দশ বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই এখনও রাস্তার উপরে বসবাস করছে। রাস্তাঘাট এখনও নির্মাণ হয়ে পারেনি। বেড়িবাঁধগুলো এখনও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। যত দ্রুত সম্ভব আগামী বর্ষাকাল আসার পূর্বে এ এলাকার ঝঁকিপূর্ণ বাধগুলো মেরামত করা একান্ত দরকার।

সংবাদটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করা হলো

এ ধরনের আরো সংবাদ

© All rights reserved by www.banglardinkal.com (Established in 2017)

Hwowlljksf788wf-Iu