সত্যি কি ষোলো আনা ফাঁকি দিয়েছে ভারত ?

85

হাসান ইবনে হামিদ
রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এক ভিন্ন যাত্রা শুরু হয়েছে। বিগত দশ বছরে এই সম্পর্ক শুধু মৌখিক সম্পর্কের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং উন্নয়ন সহযোগিতায় রূপ নিয়েছে। ২০১০ সালের এলওসি চুক্তির মাধ্যমে এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় ভারত বাংলাদেশের অংশীদার হয়। এখন পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশের মধ্যকার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের তিনটি লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এইএলওসি’র মাধ্যমে যেখানে প্রতিবেশীদেশ ভারত ধীরে ধীরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হয়ে উঠছে। কিন্তু সম্প্রতি অনেকেই এইএলওসি’ কে ষোলো আনাই ফাঁকি বলে বিবৃতি দিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পসহ সড়ক-রেল-নৌ-বিমান যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ইত্যাদি খাতে এইএলওসি’র আওতায় ভারত বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে। কিন্তু তারপরেও এই প্রশ্নগুলো কেনো উত্থাপিত হয়েছে! কেনোইবা জেনে বুঝে অনেকেই এইএলওসি নিয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত! যারা জেনেবুঝে এই অপপ্রচারে শামিল হয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমার এই লেখা নয় বরং যারা সেই অর্বাচীন লেখা পড়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন তাদেরকে প্রকৃত বিষয়টা জানানোর জন্য আমার এই লেখা। ভারত বাংলাদেশের মাঝে হওয়া এলওসি কতোটুকু কার্যকর বাবাস্তবায়ন হয়েছে আর কতোটুকু হয়নি এবং কেনো হয়নি সেবিষয়ে পরিস্কার ধারণা না থাকলে অনেকের নানামুখী বক্তব্য সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতেপারেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এখন পর্যন্ত তিনটি এলওসি স্বাক্ষরিত হয় যার প্রথমটি হয় ২০১০ সালে। সেসময় বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ১০০কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সুবিধা বাড়ায় দেশটি। এরপর ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের এলওসিচুক্তি ও ২০১৭ সালে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের তৃতীয় এলওসি চুক্তি হয়। এই তিন এলওসির মাধ্যমে সবশেষে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এখন প্রশ্ন ওঠেছে, এরকী পরিমাণ কাজ এখন পর্যন্ত হয়েছে। অনেকেই কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বলতে চাইছেন ঋণ চুক্তির পর ১০ বছর পার হলেও ভারত তাদের কথা রাখেনি! কিন্তু এই কথা রাখা বা না রাখার বিষয়টা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার সাথে মিলিয়ে যদি আমরা দেখি তবেই পরিস্কার হবে ভারত আসলেই কি আমাদের ষোলো আনা ফাঁকিদিয়েছে কিনা!

প্রথমেই আসবো ২০১০ সালের এলওসির দিকে। ২০১০ সালে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয় ভারত। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে টানাপড়েনের সময় ভারত সরকার ওই ১০০কোটি ডলারের মধ্যে ১৪ কোটি ডলার পদ্মা সেতুতে অনুদান দেয়। বাকি ৮৬ কোটি ডলারের প্রথম ঋণ চুক্তি সই হয় পণ্য কেনাকাটা, রেলওয়ে অবকাঠামো নির্মাণ, নদী খনন, সেতু নির্মাণ, বাস, রেলের ইঞ্জিন ও বগি কেনাকাটা এবং সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সংস্কারের জন্য। চুক্তির ১৫ প্রকল্পের মধ্যে ১২টি শেষ হয়েছে। ৮৬ কোটি ডলারের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি ডলার। ২৬ কোটি ডলার এখনো খরচ হয়নি। প্রথম এলওসির এই তিন কাজ সম্পন্ন না হওয়াকে কেন্দ্র করে অনেকেই অনেক বক্তব্য দিচ্ছে কিন্তু কেনো সম্পন্ন হয়নি বা কাজের অগ্রগতি কতোদূর সেবিষয়গুলো সম্পর্কে তারা কেউই অবগত না। বিশেষ করে প্রথম এলওসির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন খুলনা থেকে মোংলাবন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে জটিলতা এখানে উল্লেখ করতেই হয়। ঠিকাদারের সঙ্গে এই প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে ২০১৬ সালে। কারণ ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যার কারণে প্রকল্প শুরু করা যায়নি। এখন ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ না হলে নিশ্চয়ই ঋণপ্রকল্পের টাকা কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠান আগে দিয়ে দেবেনা। তার মানে এখানে প্রকল্পের ঋণ দাতা দেশের চাইতে ও ঋণ গ্রহীতা মানে টেন্ডার প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা রয়েছে। তাছাড়া বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা বাকি দুইটি অবকাঠামোগত কাজ ও একটু বিলম্বে শুরু হবার পেছনে একটি বিশেষ কারণের কথা উল্লেখ করেছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (এশিয়া) জাহিদুল হক। তিনি এক বেসরকারী গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে এই বিলম্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নকশা পরিবর্তনের বিষয়টা। অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলোর নকশায় নাকি বেশকয়েক বার পরিবর্তন করা হয়েছে। এ পরিবর্তনে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সব অংশীদারের সম্মতি নিতে হয়েছে। একারণে সময় মতো নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তার মানে কি দাঁড়াচ্ছে? প্রকল্পের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে দাতার সমস্যা এখানে মুখ্য না, বরং প্রকল্পের নকশা জটিলতাবা অনুমোদন ও কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের ধীরগতি একটা কারণ হতে পারে। তবে এখন কাজ দ্রæতই এগুচ্ছে, আশা করা হচ্ছে আগামী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

এবার আসি দ্বিতীয় এলওসি;র দিকে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের দ্বিতীয় এলওসি চুক্তি হয়। সেবছরের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী বাংলাদেশে সফরকালে এই এলওসি চুক্তি ঘোষণা করেন। এই ঋণ চুক্তির অধীনে ১৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব প্রকল্পে রেল, বিদ্যুৎ, সড়ক ও পরিবহণ, স্বাস্থ্য ও কারিগরি শিক্ষা উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এরমধ্যে এ পর্যন্ত ১৩ প্রকল্পে পরামর্শক/কেনাকাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এই চুক্তির আওতায় দেড়কোটি ডলার খরচ হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেক গুলোবাস্তবায়িত হয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ধীন।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের তৃতীয় এলওসি চুক্তি হয়। সেবছর এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে এই এলওসি চুক্তি হয়। এই এলওসি চুক্তির অধীনে আরও ১৬ টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই এলওসির অধীনে যে প্রকল্পগুলো পড়েছে তা হলোঃ পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ অন্যত্র নেওয়ার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, পায়রা বন্দর টার্মিনাল নির্মাণ, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার, সৈয়দপুর বিমান বন্দর আধুনিকায়ন, বেনাপোল থেকে যশোর হয়ে নড়াইল-ভাঙ্গা পর্যন্ত ১৩৫ কিলোমিটার সড়ককে চারলেনে উন্নীত করা, মোংলা বন্দর উন্নয়ন, মিরসরাইতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলপ্রতিষ্ঠা, ঢাকার রাস্তায় এক লাখ এলইডি বাতি সংস্থাপন, মিরসরাইয়ের বারইয়ারহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত সড়ক চারলেনে উন্নীত করা এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত দ্বৈতগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে ৫টি প্রকল্প আছে টেন্ডারিং পর্যায়ে, বাকি ১১টি প্রকল্প আছে ডিপিপি পর্যায়ে। এ পর্যন্ত এসেছে ১২ লাখ ডলার। এবছরের এপ্রিলে প্রতিরক্ষাখাতে কেনা কাটার জন্য ৫০ কোটি ডলারের শেষ ঋণ চুক্তিটি সই হয়। তবে এর আওতায় কী কী কেনাকাটা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আর তাই এই প্রকল্পটিও একটু দেরি হচ্ছে।

এবার আসছি এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কিছুটা ধীরগতির কারণ কি সেই বিষয়ে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করুন, প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় এলওসির বেশির ভাগ প্রকল্পই ছিলো অবকাঠামোগত। এখানে অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয় যা আমাদের অনেকের অজানা। এই ধাপগুলো অতিক্রমের পর কার্যকর পর্যায়ে প্রকল্প কে নিয়ে যেতে হয়। প্রথমত, ভারতের সম্মতি পাওয়ার পর প্রকল্পগুলোর পরামর্শক নিয়োগে যেতে হবে। পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র আহ্বানের আগে ভারত থেকে দরপত্র দলিলে সম্মতি আদায় করতে হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তির আগে ভারতের সম্মতি নিতে হয়। এরপর ভৌত কাজের জন্য দরপত্র দলিল তৈরি করে আবার ও সম্মতি আদায়ে হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও এক্সিম ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে যত বার দরপত্র দলিল সংশোধন করা হয়, ততবারই ভারতের অনুমোদন নিতে হয়। দরদাতা প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করার আগেওএ-সংক্রান্ত কাগজপত্র এক্সিম ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এভাবে প্রতিটি অনুমোদনে দুই থেকে চার বছর সময় লাগে।

আবার প্রথম এলওসির বেশ কিছু কয়েকটি প্রকল্প ধীরগতির হয়েছে কারণ ২০১০ সালের আগস্টে প্রথম চুক্তিটিসই হয়েছিল প্রকল্প চূড়ান্ত হওয়ার আগেই। তাই প্রকল্প চূড়ান্ত করা আর ভারত থেকে কেনা কাটার শর্তশিথিল করা—এদুটি বিষয় সুরাহা করতে দেরি হয়েছিল। তাছাড়া প্রকল্প ছাড়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সরাসরি ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে যাওয়ায় অতিরিক্ত সময় লেগেছিল। তাই যারা দাবী করছেন, বাংলাদেশকে ১৬ আনাই ফাঁকি দিয়েছে ভারত তাদের আগে জানতে হবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে জটিলতাসমূহ। জানতেহবে, প্রকল্পের জায়গা অধিগ্রহণ বা নকশা ঠিক না থাকলে কখনোই প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ আগে এসে আপনার ঘরে বসে থাকবে না। বরং অবকাঠামোগত এসব উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক সূক্ষ্মভাবে এইজটিল ধাপগুলো পাড়ি দিয়ে একটি প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করতে হয়। ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতির এক বছরের মাথায় যদি আমরা প্রকল্পবাস্তবায়ন দেখতে চাই তবে সেটা হবে আকাশ কুসুম কল্পনা। তাই এলওসির সার্বিক বিষয় জেনে বুঝেই আমাদের সবার বক্তব্য দেয়া উচিত। আমরা আশা রাখবো, এমন কোন বক্তব্য বা বিবৃতি যেনো দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে না আসে যা দুই দেশের সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। মনে রাখতে হবে, ‘গণভবন’ ও ‘জনপথরোড’ এর সম্পর্ক ঐতিহাসিক, চিরঞ্জীবএ বংশ্বাশ্বত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here